মুভি রিভিউ : ঘরে অ্যান্ড বাইরে

মৈনাক ভৌমিক যে একজন বড়ো মাপের রবীন্দ্রভক্ত সেটি আর কারও বোঝার বাকি থাকার কথা নয় যদি কেউ 'ঘরে & বাইরে' সিনেমাটি দেখে থাকেন। এখানে না থেকেও আছেন কবিগুরু ও বিখ্যাত ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পুরো সিনেমাই যেন রবি ঠাকুরকে তুলে ধরছে তবে কিছুটা ভিন্ন ছাঁয়ায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৯ সালে লিখেছিলেন শেষের কবিতা। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হলো অমিত এবং লাবন্য। মৈনাক ভৌমিক এ চরিত্রের নাম দুটো রেখে দিয়েছেন। ঘরে বাইরে নামেও উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরেকটি উপন্যাস রয়েছে যা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমার নাম রাখা হয়েছে ঘরে & বাইরে। মৈনাক শুধু রবি ঠাকুরেই থাকেন নি, স্মরণ করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
Ghare & Baire
ক্ল্যাসিক্যাল ও রোমান্টিক জনরার সাথে একটু কমেডি যুক্ত থাকা অনেক সিনেমাই দেখেছি। কিন্তু অন্য সিনেমাগুলো থেকে একটু আলাদা রকমের স্বাদ রয়েছে 'ঘরে & বাইরে'তে। শেষের কবিতার মতোই আধুনিক সময়ের শিক্ষিত, মার্জিত ও অভিজাত শ্রেণির মানুষের গল্প দেখানো হয়েছে এখানে।
অমিত ও লাবণ্য শিশুকাল থেকে একসাথে বড়ো হয়েছে। একজন মিউজিক থেরাপিস্ট ও আরেকজন একটি মিউজিক কোম্পানির মার্কেটিং অ্যানালিস্ট। যারা একটি ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেছিল 'ঘরে & বাইরে' নামে। লাবন্য চায় কলকাতা শহরে এমন একটি ক্লাব বানাতে যেখানে শুধু বাংলা গানই বাজানো হবে যেহেতু শুধু বাংলা গান বাজানো হয় বা গাওয়া হয় এমন কোনো ক্লাব সেখানে নেই। তবে ও স্বপ্ন তখন পূরণ হয় না, ভাগ্য সমর্থন করেনি। কারণ অপ্রত্যাশিতভাবে কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই অমিত শহর ছেড়ে যায়। এই অমিতের ছেড়ে যাওয়া, অমিত-লাবন্যর না বলা কিছু বোধগম্য কথা, চিরায়ত বাংলার কিছু মৌলিক উপাদান নিয়েই এগিয়েছে এ সিনেমা। তবে গল্পের শেষ অংশ পর্যন্ত তাদের হাতে গড়া ব্যান্ডই চালকের ভূমিকায় থেকেছে যা নামকরণের স্বার্থকতারও জানান দেয়।
লাবন্য চরিত্রে কোয়েল মল্লিক ও অমিত চরিত্রে যীশু সেনগুপ্ত অভিনয় করেছেন। আমি এখানে দুইয়ে দুইয়ে চার না বলে বলতে চাই, এ গল্পটি কোয়েল ও যীশুকেই কল্পনা করে লিখেছিলেন মিস্টার ভৌমিক। যার জন্য এই দুই চরিত্র ফুটিয়ে তোলায় কোনো দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায় নি। দুইজনেই যে খুব এক্সট্রা কিছু করেছেন তেমন নয়, তাদের স্বভাবসূলভ অভিনয়ই করেছেন আর তা এ গল্পের জন্য মানানসই ছিল। চমৎকার উপস্থিতি দুইজনের।
গল্পে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন অপরাজিতা আঢ্য ও বিশ্বনাথ বসু। এদের চরিত্রের নাম যথাক্রমে সোহিনি এবং বন্টো। এরা অমিত-লাবন্য থেকে বয়সে বড়ো হলেও এই চারজন বন্ধু। এদের মধ্যে মানসিক বয়সের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। পাশে থেকে জয় সেনগুপ্তও একটি ভাইটাল ক্যারেক্টার প্লে করার দারুণ সুযোগ লুফে নিয়েছেন এবং কৃতিত্বের সাথেই কাজটি করেছেন।
'ঘরে & বাইরে'র গল্পে আমরা সংস্কৃতি ও সাহিত্যপ্রেম, বন্ধুত্ব, অভিজাত শ্রেণির গল্প, নীরবে চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠিত হবার যুদ্ধ, সংসার ও সাংসারিক প্রেম, সন্তানের প্রতি মা-বাবার যত্নশীলতা ও উদ্বেগসহ নানান কিছু দেখতে পাই। কিন্তু এসব ছাড়িয়ে সুন্দর একটি প্রেমের গল্প প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবে শিরোনামের দুই শব্দের মাঝে ইংরেজির & না দিয়ে বাংলার ও দিলেই ভালো হতো যেহেতু এখানে বাংলা মিউজিকের জয়গান করা হয়েছে।
গল্পে মৈনাক ভৌমিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুসরণ করেছেন কিন্তু তিনি চিরায়ত বাংলা সিনেমার বৈশিষ্ট্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টাটুকু করেন নি। তাতে কী? ছকের মধ্যে থেকেও যে ছকের বাইরের গল্প সাজানো যায় এবং তা দক্ষতার সাথে বলাও যায় সেটি প্রত্যক্ষ করলাম।
যারা শেষের কবিতা উপন্যাসটি পড়েছেন তাঁরা তার পরিণতি জানেন। অনেকেই দুঃখ পেয়ে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথের জন্ম দেয়া অমিতের আচরণে। তবে কি সেই দুঃখ ভোলানোর দায়িত্ব ঘাড়ে তুলেছেন মৈনাক? যদিও শেষের কবিতার কিছুই এখানে নেই, তবে গল্প, গল্পের গাথুনি, সামগ্রিক সিনারিও তা-ই বলে।
এখানে সাহিত্যের কাকাবাবু এবং ব্যোমকেশকে ছুঁয়ে যাওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু স্ক্রিনিং ভালো হয়নি, পাশাপাশি তা আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে।
সিনেমার সাথে বাস্তবকে মেলানো বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এই গল্পটি যে ধরণের তাতে 'লাবন্যর মা' চরিত্রকে একদম যাচ্ছেতাই ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে লেখক যেভাবে লিখেন না কেন অভিনেত্রী হিসেবে ঠিকঠাক কাজ করেছেন স্বাগতা বসু।
লেখক ও পরিচালক হিসেবে মৈনাক ভৌমিক যা করেছেন তাতে আমি একজন দর্শক হিসেবে সন্তুষ্ট। সিনেমাটির ব্যকাগ্রাউন্ড স্কোরও ভালো যা বানিয়েছেন স্যাভি এবং অনুপম রায়ের মিউজিক যুক্ত থাকায় আরো কয়েকগুন সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে যীশু-কোয়েল জুটির এ সিনেমা। হৃদয়ের রঙ টাইটেলের গানটিতো আমার ভীষণ পছন্দের, অনুপমের এ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন লগঞ্জিতা চক্রবর্তি। আর যখন পর্দায় অনুপম রায়ের সাথে মোনালি ঠাকুরের ডুয়েট ‘তাঁরা খশে পড়ে আকাশে’ কোয়েল ও যীশুর ঠোঁটে দেখা যায়, তখন যে কারো মধ্যেই বিশেষ রকম প্রেমানুভূতি কাজ করবে। চিত্রধারণ, সম্পাদনা বা কালার গ্রেডিংয়ে সর্বোচ্চ মান রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে বাজেট অনুসারে।
সুরিন্দর ফিল্মসের ব্যানারে ২০১৮ সালের ৩০ মার্চ তারিখে ভারতে মুক্তি পাওয়া এই 'ঘরে & বাইরে' নামের সুন্দর সিনেমাটি আমার দেখার সুযোগ হলো ২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারীতে যখন লকডাউনে ঘরে থেকে বাইরের কল্পনা করছি তখন। ভালো একটি সিনেমা। নিসপাল সিং-এর উদ্যোগে মৈনাক-যীশু-কোয়েল আরও কিছু কাজ করুক।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান


Previous Post Next Post