প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম (ক্যাজুয়াল আলোচনা)

প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম (ক্যাজুয়াল আলোচনা)

বাংলা বানানের নিয়ম না জানার কারণে আমরা লিখতে গিয়ে ভুল করে থাকি। আবার বানানের নিয়ম পড়ার পরেও অনেক সময় ভুল করে থাকি ভালো করে না বোঝার কারণে। তাই বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুসরণ করে ও বাংলা ব্যাকরণে দক্ষ এমন কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে এখানে আমি চেষ্টা করলাম একটু ক্যাজুয়ালি বানানের নিয়ম তুলে ধরার। কোথাও কোনো ভুল পাওয়া গেলে আমাকে জানাবেন ইমেইলে অথবা এখানের কমেন্ট বক্সে (ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info)।



চলুন শুরু করা যাক…
১. দূরন্ত নাকি দুরন্ত? দূর্গা নাকি দুর্গা? লিখতে গিয়ে এরকম দোটানায় বহুবার পড়েছি। কিন্তু যখন জানলাম, 'দূরত্ব' বোঝায় না এরূপ শব্দে উ-কার হবে। অর্থাৎ ‘দুর’ (‘দুর’ উপসর্গ) বা ‘দু+রেফ’ হবে।
যেমন দুরবস্থা, দুরন্ত, দুরাকাঙ্ক্ষা, দুরারোগ্য, দুরূহ, দুর্গা, দুর্গতি, দুর্গ, দুর্দান্ত, দুর্নীতি, দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, দুর্নাম, দুর্ভোগ, দুর্দিন, দুর্বল, দুর্জয় ইত্যাদি।

 ২. দূরত্ব বোঝায় এমন শব্দে ঊ-কার যোগে ‘দূর’ হবে।
যেমন দূর, দূরবর্তী, দূর-দূরান্ত, দূরীকরণ, অদূর, দূরত্ব, দূরবীক্ষণ ইত্যাদি।

৩. আমাদের প্রায়ই ভাবতে হয় চাকরিজীবী নাকি চাকরিজিবী, বুদ্ধিজীবি নাকি বুদ্ধিজীবী এবং আরও যেসব শব্দ বা পদের শেষে ‘জীবী’ যুক্ত রয়েছে তার সঠিক বানান নিয়ে। এজন্যই আমাদের জেনে নেয়া দরকার পদের শেষে ‘-জীবী’ ঈ-কার দিয়ে লিখতে হবে।
যেমন  কৃষিজীবী, পেশাজীবী, চাকরিজীবী, শ্রমজীবী, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি।

৪. বেশিরভাগ সরকারি কাগজপত্র বা ওয়েবসাইট, ‘কার্যাবলি’ শব্দকে ই-কার দিয়ে লিখে ‘কার্যাবলী’ দেখে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এরকম যত পদের শেষে ‘-বলি’ (আবলি) রয়েছে তা ই-কার দিয়ে লিখতে হবে।
পদের শেষে ‘-বলি’ (আবলি) ই-কার হবে।
যেমন কার্যাবলি, শর্তাবলি, ব্যাখ্যাবলি, নিয়মাবলি, তথ্যাবলি ইত্যাদি।

৫. ষত্ব-বিধান অনুযায়ী বাংলা বানানে ট-বর্গীয় বর্ণে ‘ষ্ট’ ব্যবহার হবে।
যেমন বৃষ্টি, কৃষ্টি, সৃষ্টি, দৃষ্টি, মিষ্টি, নষ্ট, কষ্ট, তুষ্ট, সন্তুষ্ট ইত্যাদি।
কিন্তু বিভিন্ন বিদেশি শব্দে ‘ষ্ট’ নয় বরং লিখতে হবে ‘স্ট’। বিশেষ করে ইংরেজির যে শব্দগুলোতে st যুক্ত রয়েছে সেখানে ‘স্ট’ হবে।
যেমন পোষ্ট না লিখে লিখতে হবে ‘পোস্ট’, ফটোষ্ট্যাট না লিখে লিখতে হবে ‘ফটোস্ট্যাট’। এরকম আরও কিছু শব্দ হলো  স্টার, স্টাফ, স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, স্ট্যাটাস, মাস্টার, ডাস্টার, পোস্টার, স্টুডিও, ফাস্ট, লাস্ট, বেস্ট ইত্যাদি।

৬. ‘পূর্ণ’ এবং ‘পুন’ (পুনঃ/পুন+রেফ/পুনরায়) ব্যবহারের সময় উ-কার ও ঊ-কার ব্যবহারে মনে রাখতে হবে ইংরেজিতে Full/Complete অর্থে প এর সাথে ঊ-কার (ূ) এবং র্ণ যোগে ব্যবহার হবে।
যেমন পূর্ণরূপ, পূর্ণমান, সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ ইত্যাদি।
‘পুন’  ইংরেজিতে Re-অর্থে প এর সাথে উ-কার (ু) কার হবে
যেমন পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পুনঃপুন, পুনর্জীবিত, পুনর্নিয়োগ, পুনর্নির্মাণ, পুনর্মিলন, পুনর্লাভ, পুনর্মুদ্রিত, পুনরুদ্ধার, পুনর্বিচার, পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন, পুনর্বাসন ইত্যাদি।

৭. বিপদগ্রস্থ নাকি বিপদগ্রস্ত? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে গেলে জানা প্রয়োজন পদের শেষে ‘-গ্রস্থ’ হবে না, হবে ‘-গ্রস্ত’। সুতরাং বিপদগ্রস্ত হলো সঠিক বানানের শব্দ।
যেমন বাধাগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত, হতাশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত ইত্যাদি।

৮. একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সাজানো ফুলের তোড়ায় ‘শ্রদ্ধাঞ্জলী’ অথবা ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শব্দ কে না দেখেছে? এখন প্রশ্ন হলো কোনটি সঠিক? ই-কার যোগে শ্রদ্ধাঞ্জলি নাকি ঈ-কার যোগে শ্রদ্ধাঞ্জলী?
সহজ উত্তর, ‘অঞ্জলি’ দ্বারা গঠিত সকল শব্দে ই-কার হবে।
যেমন অঞ্জলি, গীতাঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি ইত্যাদি।

৯. ‘কে’ এবং ‘-কে’ ব্যবহার: শুধু প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কে’ আলাদা রাখুন।
যেমন ফাতিমা কে?
অন্যসব ক্ষেত্রে ‘-কে’ আগের শব্দের সাথে মিলিয়ে লিখতে হবে।
যেমন ফাতিমাকে যেতে বলো।

১০. বিদেশি শব্দে কখনোই ণ, ছ, ষ ব্যবহার করবেন না।
যেমন হর্ন, ফার্নিচার, কর্নার, সমিল (করাতকল), স্টাফ, স্টার, আস্সালামু আলাইকুম, ইনসান, বাসস্ট্যান্ড ইত্যাদি।

১১. অ্যা ও এ ব্যবহার: বিদেশি বাঁকা শব্দের উচ্চারণে ‘অ্যা’ ব্যবহার হয়, ‘এ্যা’ লিখবেন না।
যেমন অ্যান্ড (And), অ্যাড (Ad/Add), অ্যাকাউন্ট (Account), অ্যাম্বুলেন্স (Ambulance), অ্যাসিস্ট্যান্ট(Assistant), অ্যাডভোকেট (Advocate), অ্যাকাডেমিক (Academic), অ্যাডভোকেসি (Advocacy), ম্যানেজার (Manager) ইত্যাদি।
অবিকৃত বা সরলভাবে উচ্চারণে ‘এ’ হয়। যেমনএন্টার (Enter), এন্ড (End), এডিট (Edit) ইত্যাদি।
তবে কিছু তদ্ভব এবং বিশেষবভাবে দেশি শব্দ রয়েছে যার অ্যা-কারযুক্ত রূপ বহুল-পরিচিত। যেমন: ব্যাঙ, চ্যাঙ, ল্যাঙ, ল্যাঠা। এসব শব্দে অ্যা অপরিবর্তিত থাকবে।

১২. ইংরেজি বর্ণ S-এর বাংলা প্রতিবর্ণ হবে ‘স’ এবং sh, -sion, -tion শব্দগুচ্ছে ‘শ’ হবে।
যেমন সিট (Seat/Sit), শিট, (Sheet), রেজিস্ট্রেশন (Registration), মিশন (Mission) ইত্যাদি।

১৩. আরবি বর্ণ (শিন)-এর বাংলা বর্ণ রূপ হবে ‘শ’ এবং (সা), ( সিন) ও (সোয়াদ)-এর বাংলা বর্ণ রূপ হবে ‘স’।
যেমন সালাম, শাহাদত, শামস্, ইনসান ইত্যাদি। আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা থেকে আগত শব্দসমূহে ছ, ণ ও ষ ব্যবহার হবে না (৯ নং এর মতো)।

১৪. তৎসম শব্দে ছাড়া খাঁটি বাংলা ও বিদেশি শব্দে ষ ব্যবহার করা যাবে না। এখানে অবশ্যই ষত্ব-বিধান, উপসর্গ, সন্ধি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। আমরা জানি ‘শ’ উচ্চারণ হয় এমন কিছু শব্দ রয়েছে যা ‘স’ দিয়ে লিখতে হয়। ‘স’-এর স্বতন্ত্র উচ্চারণ হচ্ছে সমীর, সাফ, সাফাই ইত্যাদি। যুক্ত বর্ণ, ঋ-কার ও র- ফলা যোগে যুক্তধ্বনিতে ‘স’-এর উচ্চারণ পাওয়া যায়।
যেমন সৃষ্টি, স্মৃতি, স্পর্শ, স্রোত, শ্রী, আশ্রম ইত্যাদি।

১৫. সমাসবদ্ধ পদ, বহুবচন রূপী শব্দের মাঝে ফাঁক রাখা যাবে না।
যেমন চিঠিপত্র, আবেদনপত্র, ছাড়পত্র (পত্র), বিপদগ্রস্ত, হতাশাগ্রস্ত (গ্রস্ত), গ্রামগুলি/গ্রামগুলো (গুলি/গুলো), রচনামূলক (মূলক), সেবাসমূহ (সমূহ), যত্নসহ, পরিমাপসহ (সহ), ত্রুটিজনিত, (জনিত), আশঙ্কাজনক, বিপজ্জনক (জনক), অনুগ্রহপূর্বক, উল্লেখপূর্বক (পূর্বক), প্রতিষ্ঠানভুক্ত, এমপিওভুক্ত, এমপিওভুক্তি (ভুক্ত/ভুক্তি), গ্রামভিত্তিক, এলাকাভিত্তিক, রোলভিত্তিক (ভিত্তিক), অন্তর্ভুক্তকারণ, এমপিওভুক্তকরণ, প্রতিবর্ণীকরণ (করণ), আমদানিকারক, রফতানিকারক (কারক), কষ্টদায়ক, আরামদায়ক (দায়ক), স্ত্রীবাচক (বাচক), দেশবাসী, গ্রামবাসী, এলাকাবাসী (বাসী), সুন্দরভাবে, ভালোভাবে (ভাবে), চাকরিজীবী, শ্রমজীবী (জীবী), সদস্যগণ (গণ), সহকারী, আবেদনকারী, ছিনতাইকারী (কারী), সন্ধ্যাকালীন, শীতকালীন (কালীন), জ্ঞানহীন (হীন), দিনব্যাপী, মাসব্যাপী, বছরব্যাপী (ব্যাপী) ইত্যাদি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জাহাঙ্গীরনগর, । এ ছাড়া যথাবিহিত, যথাসময়, যথাযথ, যথাক্রমে, পুনঃপুন, পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহিঃপ্রকাশ শব্দগুলো একত্রে ব্যবহার হয়।

১৬. আজকাল প্রতি ইদের সময়ই আমাদের মধ্যে অনেকে বিতর্কে মেতে ওঠেন, ই-কার যোগে ‘ইদ’ এর চেয়ে ঈ-কার যোগে ‘ঈদ’ দেখতেই ভালো লাগে। এখানে আমাদের জানা উচিৎ বিদেশি শব্দ, মিশ্র শব্দে ই ও ই-কার ব্যবহার হবে, ঈ কিংবা ঈ-কার নয়।
যেমন ইদ, জানুয়ারি, ফ্রেরুয়ারি, ডিগ্রি, চিফ, শিট, শিপ, নমিনি, কিডনি, ফ্রি, ফি, ফিস, স্কিন, স্ক্রিন, মাস্টারি ট্রেজারি, ব্রিজ, প্রাইমারি, মার্কশিট, হেডমৌলভি, নানি, রিক্সা, বাবুর্চি ইত্যাদি।
অ-তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব ও দেশি শব্দেও ই-কার ব্যবহার হবে।
যেমন গিন্নি, কুচ্ছিত, সরকারি, তরকারি, কুড়ি, বুড়ি, খুকি, গাড়ি, বাড়ি, দাড়ি, শাড়ি, চুরি, চাকরি, মালি, পাগলামি, পাগলি, বোমাবাজি, দাবি, হাতি, বেশি, খুশি, সিঙ্গি, ছুরি, টুপি, দিঘি ইত্যাদি।
১৭. উঁয়ো (ঙ) ব্যবহার যোগে কিছু শব্দ যেখানে অনুস্বার বা অনুঃস্বর (ং) ব্যবহার করা নিষেধ।
যেমন অঙ্ক, অঙ্কন, অঙ্কিত, অঙ্কুর, অঙ্গ, অঙ্গন, আকাঙ্ক্ষা, আঙ্গুল/আঙুল, আশঙ্কা, ইঙ্গিত, উলঙ্গ, কঙ্কর, কঙ্কাল, গঙ্গা, চোঙ্গা/চোঙা, টাঙ্গা, ঠোঙ্গা/ঠোঙা, দাঙ্গা, পঙ্ক্তি, পঙ্কজ, পতঙ্গ, প্রাঙ্গণ, প্রসঙ্গ, বঙ্গ, বাঙালি/বাঙ্গালি, ভঙ্গ, ভঙ্গুর, ভাঙ্গা/ভাঙা, মঙ্গল, রঙ্গিন/রঙিন, লঙ্কা, লঙ্গরখানা, লঙ্ঘন, লিঙ্গ, শঙ্কা, শঙ্ক, শঙ্খ, শশাঙ্ক, শৃঙ্খল, শৃঙ্গ, সঙ্গ, সঙ্গী, সঙ্ঘাত, সঙ্গে, হাঙ্গামা, হুঙ্কার।

১৮. অনুস্বার বা অনুঃস্বর (ং) ব্যবহার যোগে কিছু শব্দ, এখানে উঁয়ো (ঙ) ব্যবহার নিষেধ
যেমন কিংবদন্তী, সংজ্ঞা, সংক্রামণ, সংক্রান্ত, সংক্ষিপ্ত, সংখ্যা, সংগঠন, সংগ্রাম, সংগ্রহ, সংগৃহীত।
[দ্রষ্টব্য: বাংলা ও বাংলাদেশ শব্দ দুটি অনুস্বার (ং) দিয়ে লিখতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানে তাই করা হয়েছে।]
১৯. ‘কোণ, কোন ও কোনো’-এর ব্যবহার
কোণ : ইংরেজিতে Angle/Corner () অর্থে।
কোন : উচ্চারণ হবে কোন্। বিশেষত প্রশ্নবোধক অর্থে ব্যবহার করা হয়।
যেমন তুমি কোন দিকে যাবে?
          কোন কোন ভাষা তুমি জানো?
কোনো : ও-কার যোগে উচ্চারণ হবে।
যেমন যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।
২০. বাংলা ভাষায় চন্দ্রবিন্দু একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণ। চন্দ্রবিন্দু যোগে শব্দগুলোতে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করতে হবে; না করলে ভুল হবে। অনেক ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার না করলে শব্দে অর্থের পরিবর্তন ঘটে। এ ছাড়া চন্দ্রবিন্দু সম্মানসূচক বর্ণ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
যেমন ক. তাহাকে>তাঁহাকে, তাকে>তাঁকে ইত্যাদি। খ. ‘খাঁ’ না লিখে যদি লেখা হয় ‘খা’ তাহলে শব্দের অর্থ বদলে যায়। খাঁ হলো কোনো বংশের নাম খান এর সংক্ষিপ্ত রূপ। আর খা হলো কাউকে কিছু খেতে বলা।

২১. ও-কার ব্যবহার করা ও না করার আগে আপনার জানা প্রয়োজন, অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়া পদ এবং বিশেষণ ও অব্যয় পদ বা অন্য শব্দ যার শেষে ও-কার যুক্ত না করলে অর্থ বুঝতে ভুল দেরি হতে পারে এমন শব্দে ও-কার ব্যবহার হবে।
একটু সোজা কথায় পরিষ্কার করা যেতে পারে। একটি শব্দ ‘ভাল’। আমাদের জানামতে ‘ভাল’ এর দুইটি অর্থ ও দুইরকম উচ্চারণ আছে। একটির অর্থ হলো ‘কপাল’ যার উচ্চারণ ‘ভাল্‌’ এবং আরেকটি ‘ভালো’ উচ্চারণের সাথে ‘কোনো কিছুর প্রত্যাশিত অবস্থা’ বোঝায় বা এমন অর্থ প্রদান করে। যদি একই রকম বানানে লেখা শব্দ দুইরকম অর্থ ও উচ্চারণ প্রদান করে, তাহলে উচ্চারণের ওপর ভিত্তি করে উপযুক্ত শব্দের শেষে ও-কার যুক্ত করতে হবে। তারমানে এ নয়, ও-কার যুক্ত না করলে ভুল হবে।
যেমন মতো, হতো, হলো, কেনো (ক্রয় করো), ভালো, কালো, আলো ইত্যাদি।
বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া বা অর্থের ও উচ্চারণের পার্থক্য না থাকলে ও-কার ব্যবহার করা যাবে না।
যেমন ছিল, করল, যেন, কেন (কিসের জন্য), আছ, হইল, রইল, গেল, শত, যত, তত, কত, এত ইত্যাদি।

২২. বিশেষণবাচক আলি প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ই-কার হবে।
যেমন সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, হেঁয়ালি, খেয়ালি, মিতালি ইত্যাদি।
[দ্রষ্টব্য: কিন্তু যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম যদি ঈ-কার দিয়ে নিবন্ধিত কিংবা স্বীকৃত থাকে তাহলে তা ঈ-কার দিয়েই লিখতে হবে (সোনালী ব্যাংক) । তবে সাধারণ শব্দে অবশ্যই ই-কার হবে।]

২৩. সজিব নাকি সজীব? রাজিব নাকি রাজীব? কোন বানানটি সঠিক?
এ পর্যন্ত আমরা য জেনেছি তাতে, নামের বানানে ই-কার ব্যবহার হয়। কিন্তু এর ব্যাতিক্রম হয় যদি ওই নামের বিশেষ কোনো অর্থ থাকে এবং তা বিদেশি শব্দের নাম নয়।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে সজীব ও রাজীব সঠিক বানানের নাম। এরকম আরও কিছু নাম রয়েছে, যেমন: সুনীল, নীলিমা,
উলেখ্য, যদি কোনো শব্দে ‘জীব’ যুক্ত থাকে তা ঈ-কার যোগে লিখতে হবে।
যেমন: নির্জীব, জীবিকা ইত্যাদি।

২৪. অদ্ভুত কিংবা ভুতুড়ে লিখতে গিয়ে অনেকেই ঊ-কার ব্যবহার করে থাকেন যা ভুল। জেনে রাখা দরকার, সকল রকম ‘ভূত’ লিখতে ঊ-কার (ূ) কিন্তু অদ্ভুত ও ভুতুড়ে বানানে উ-কার হবে।
যেমন ভূত, ভস্মীভূত, বহির্ভূত, ভূতপূর্ব ইত্যাদি।

২৫. হীরা ও নীল অর্থে সকল বানানে ঈ-কার হবে।
যেমন হীরা, হীরক, নীল, সুনীল, নীলক, নীলিমা ইত্যাদি।

২৬. নঞর্থক পদগুলো (নাই, নেই, না, নি) আলাদা করে লিখতে হবে।
যেমন বলে নাই, বলে নি, আমার ভয় নাই, আমার ভয় নেই, হবে না, যাবে না, করো না ইত্যাদি।

২৭. শব্দের শেষে ত্ব, তা, নী, ণী, সভা, পরিষদ, জগৎ, বিদ্যা, তত্ত্ব যোগ হলে ই-কার দিয়ে লিখতে হবে।
যেমন দায়িত্ব (দায়ী), প্রতিদ্বন্দ্বিতা (প্রতিদ্বন্দ্বী), প্রার্থিতা (প্রার্থী), দুঃখিনী (দুঃখী), অধিকারিণী (অধিকারী), সহযোগিতা (সহযোগী), মন্ত্রিত্ব, মন্ত্রিসভা, মন্ত্রিপরিষদ (মন্ত্রী), প্রাণিবিদ্যা, প্রাণিতত্ত্ব, প্রাণিজগৎ, প্রাণিসম্পদ (প্রাণী) ইত্যাদি।

২৮. ঈ, ঈয়, অনীয় প্রত্যয় যোগ ঈ-কার হবে।
যেমন জাতীয় (জাতি), দেশীয় (দেশি), পানীয় (পানি), জলীয়, স্থানীয়, স্মরণীয়, বরণীয়, গোপনীয়, ভারতীয়, মাননীয়, বায়বীয়, প্রয়োজনীয়, পালনীয়, তুলনীয়, শোচনীয়, রাজকীয়, লক্ষণীয়, করণীয়।

২৯. রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না৷
যেমন অর্চনা, অর্জন, অর্থ, অর্ধ, কর্দম, কর্তন, কর্ম, কার্য, গর্জন, মূর্ছা, কার্তিক, বার্ধক্য, বার্তা, সূর্য।

৩০. দেশ, ভাষা ও জাতিতে ই-কার হবে।
যেমন ইতালি, চিলি, চিন, বাংলাদেশি, বাঙালি, হিজরি, আরবি, ফারসি, ফরাসি, ইংরেজি, জাপানি, জার্মানি, ইরানি, হিন্দি, ইত্যাদি।
এখনো দেখা যায় ‘চিন’ বানানটি ‘চীন’ লেখা হয় ঈ কার যোগে যা ভুল। যদি এখানে কেউ ই-কার দিতে অনীহা প্রকাশ করেন তাহলে তাঁর ‘চায়না’ লেখা উচিৎ।

৩১. ব্যক্তির ‘-কারী’ ও ‘-আরী’ ঈ-কার হবে।
যেমন সহকারী, আবেদনকারী, ছিনতাইকারী, পথচারী, কর্মচারী ইত্যাদি। ব্যক্তির ‘-কারী’ নয়, এমন শব্দে ই-কার হবে।
যেমন সরকারি, দরকারি ইত্যাদি।

৩২. প্রমিত বানানে শব্দের শেষে ঈ-কার থাকলে এবং এর পরে ‘গণ’ যোগ করলে অবশ্যই ঈ-কারকে ই-কার করে নিতে হয়।
যেমন সহকারী + গণ = সহকারিগণ, কর্মচারী + গণ = কর্মচারিগণ, কর্মী + গণ = কর্মিগণ, আবেদনকারী + গণ = আবেদনকারিগণ ইত্যাদি।

৩৩. ‘বেশি’ নাকি ‘বেশী’? কোনটি লিখব?
‘বেশি’ তখন ই-কার দিয়ে লিখতে হবে যখন এর অর্থ হবে অনেক বা প্রচুর (ইংরেজিতে much)।
আর শব্দের শেষে ‘-বেশী’ ঈ-কার দিয়ে লিখতে হবে।
যেমন ছদ্মবেশী, প্রতিবেশী।

৩৪. ‘ৎ’-এর সাথে স্বরচিহ্ন যোগ হলে ‘ত’ হবে।
যেমন জগৎ>জগতে জাগতিক, বিদ্যুৎ>বিদ্যুতে, বৈদ্যুতিক, ভবিষ্যৎ>ভবিষ্যতে, সাক্ষাৎ>সাক্ষাতে ইত্যাদি।

৩৫. ইক প্রত্যয় যোগে শব্দের প্রথমে অ-কার পরিবর্তন হয়ে আ-কার হবে।
যেমন অঙ্গ>আঙ্গিক, বর্ষ>বার্ষিক, পরস্পর>পারস্পরিক, সংস্কৃত>সাংস্কৃতিক, অর্থ>আর্থিক, পরলোক>পারলৌকিক, প্রকৃত>প্রাকৃতিক, প্রসঙ্গ>প্রাসঙ্গিক, সংসার>সাংসারিক, সপ্তাহ>সাপ্তাহিক, সময়>সাময়িক, সংবাদ>সাংবাদিক,প্রদেশ>প্রাদেশিক, সম্প্রদায়>সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি।

৩৬. সাধু থেকে চলিত রূপের শব্দসমূহ যথাক্রমে দেখানো হলো:
আঙ্গিনা>আঙিনা, আঙ্গুল>আঙুল, ভাঙ্গা>ভাঙা, রাঙ্গা>রাঙা, রঙ্গিন>রঙিন, বাঙ্গালি>বাঙালি, লাঙ্গল>লাঙল, হউক>হোক, যাউক>যাক, থাউক>থাক, লিখ>লেখ, গুলি>গুলো, শুন>শোন, শুকনা>শুকনো, ভিজা>ভেজা, ভিতর>ভেতর, দিয়া>দিয়ে, গিয়া>গিয়ে, হইল>হলো, হইত>হতো, খাইয়া>খেয়ে, থাকিয়া>থেকে, উল্টা>উল্টো, বুঝা>বোঝা, পূজা>পুজো, বুড়া>বুড়ো, সুতা>সুতো, তুলা>তুলো, নাই>নেই, নহে>নয়, নিয়া>নিয়ে, ইচ্ছা>ইচ্ছে ইত্যাদি।

৩৭. হয়তো, নয়তো বাদে সকল তো আলাদা হবে।
যেমন আমি তো যাই নি, সে তো আসে নি ইত্যাদি।
[দ্রষ্টব্য: মূল শব্দের শেষে আলাদা তো
ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে।]

৩৮. ঙ, ঞ, ণ, ন, ং বর্ণের পূর্বে ঁ হবে না।
যেমন খান (খাঁ), চান, চন্দ (চাঁদ), পঞ্চ, পঞ্চাশ (পাঁচ) ইত্যাদি।

৩৯. -এ/-এর, এ/এর (এ-কার দিয়ে) ব্যবহার:
সংখ্যা ও কোনো সংক্ষিপ্ত শব্দের শেষে -এ/-এর’ পৃথকভাবে লিখতে হবে, অন্যক্ষেত্রে একসাথে লিখতে হবে।
যেমন– ক. ৫-এর চেয়ে ২ কম।
খ. ডেইরি কোম্পানি লি.-এর সাথে চুক্তি করা হয়েছে।
গ. ডেইরি কোম্পানি লিমিটেডের সাথে চুক্তি করা হয়েছে।
ঘ. SMS-এর মাধ্যমে জানানো হয়েছে।
এরকমই আরও কয়েকটি উদাহরণ: বাংলাদেশ-এর না লিখে বাংলাদেশের, কোম্পানি-এর না লিখে কোম্পানির, শিক্ষক-এর না লিখে শিক্ষকের, স্টেডিয়াম-এ না লিখে স্টেডিয়ামে, অফিস-এ না লিখে অফিসে লিখতে হবে।
৪০. কি এবং কী এর সঠিক ব্যবহার।
ক. যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর হ্যা/না দিয়ে দেয়া যায় তাহলে সে প্রশ্নে ‘কি’ ব্যবহার করুন।
যেমন: তুমি কি রাকিব? তিনি কি খেয়েছেন?
খ. যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ/না দিয়ে দেয়া না যায় তাহলে সে প্রশ্নে ঈ-কার যোগে ‘কী’ লিখতে হবে।
যেমন: তোমার নাম কী? তিনি কোথায় গিয়েছেন?

৪১. কি না/ কিনা/কি-না
কি-না : এটি অশুদ্ধ। এভাবে লেখা যাবে না।
কি না : ক. সন্দেহসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
যেমন : টাকা দেবে কি না জানি না।
খ. বিতর্কসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন- আমার লেখায় কোনো ভুল আছে কি না বলো?
গ. প্রশ্নবোধক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন : তুমি যাবে কি না?
কিনা : ক. এই কারণে বা যেহেতু অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন : অসুস্থ কিনা তাই আসে নি।
খ. অর্থাৎ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন : হ্রী কিনা লজ্জা।
গ. বাক্যালঙ্কার (বাক্যে যা না থাকলেও অর্থ পরিবর্তন হয় না) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন : আর তুমি কিনা ঘরের ভেতর গিয়ে বসে আছো (এখানে কিনা শব্দটি ছাড়াও বাক্যের অর্থ একই থাকে)।

৪২. এমনকি/এমন কী
এমনকি-অধিকন্তু বা আরও অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন- এমনকি তার বইও চুরি হয়েছে।
এমন কী-সর্বনাম, বিশেষণ ও ক্রিয়া-বিশেষণ রূপে স্বতন্ত্র পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন : এমন কী ক্ষতি হয়েছে তোমার! (তোমার কতখানি ক্ষতি হয়েছে)-এখানে এমন কী একটিই পদ, ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষণ হিসেবে।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান
Previous Post Next Post