পুলিশকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলা যাবে কিনা?


আগে আমি বুঝতাম আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নামে বোধহয় একটি বিশেষ বাহিনী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেছে যেহেতু রেডিও-টেলিভিশনের বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশনে এরকম একটি নাম শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। পরে অবশ্য বুঝতে পারি এ কোনো বিশেষ বাহিনী নয় বরং বাংলাদেশ পুলিশ যে কার্যক্রম পরিচালনা করে তা আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই করে থাকে আর এ জন্য গণমাধ্যম ও এলিট শ্রেণির মানুষেরা ভালোবেসে বা তাঁদের দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে এই নামে ডাকে। একই কাজতো আরও অনেক দল করে থাকে তাহলে তাঁদেরও এই নামে না ডেকে শুধু পুলিশকে কেন ঢালাওভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলতে হবে?- এই প্রশ্নটিও ঘুরপাক খেত মাথার মধ্যে।


সম্প্রতি (এপ্রিল ৭, ২০২০) একজন পুলিশের কর্মকর্তা বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদ মাধ্যম জাগোনিউজের একটি কলামে অভিযোগ করে বলেছেন ‘বাংলাদেশ পুলিশ’কে ‘আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ বলা আর বাংলাদেশ পুলিশকে ছোট করা একই কথা যা আমার নজরে আসা মাত্রই এটি লিখছি। সহকারী পুলিশ সুপার মো. ইমরান আহম্মেদ পুলিশকে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ বলাকতটা যৌক্তিক?’ শিরোনামের এই কলামে বেশ কিছু যুক্তি তুলে প্রশ্ন করেছেন যেমন, পুলিশ বিভিন্নরকম তদন্ত করে থাকে, গোয়ান্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে, দেশের অভ্যন্তরীন বিভিন্ন শান্তিরক্ষামূলক কাজ করে থাকে তাহলে তাঁদের যথাক্রমে তদন্তকারী বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী ও অভ্যন্তরীণ শান্তিরক্ষাবাহিনী কেন বলা হয়না? পুরো আর্টিকেলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন এই বিশেষ নামে ডাকার অর্থ পুলিশকে খাটো করা। আমাদের দেশে পুলিশের অফিসিয়াল বা দাপ্তরিক নাম হলো ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ যারা এই নামের অধীনেই প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ করে থাকে তাই বলে সেই কাজের ধরণ অনুযায়ী পুলিশকে ডাকা ঠিক বলে মনে করেন না তিনি।

আমি এখানে ছোট্ট একটি উদাহরণ যোগ করতে চাই। আমরা মানুষ, সবারই আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। যেমন, দাপ্তরিকভাবে আমার নাম হলো মু. মিজানুর রহমান মিজান, কিন্তু লোকে আমাকে মিজান বলেই সম্বোধন করে। এর বাইরেও রয়েছে আমার একটি ডাকনাম, সেটি যারা জানেন এবং ওই নামে যারা ডাকতে পছন্দ করেন তাঁরা ওই নামেই ডাকেন। আমার এই দাপ্তরিক নাম, লোকের মুখে আমার ছোটো নাম এবং ডাকনামের বাইরেও বেশ কিছু নাম রয়েছে। আমি যেহেতু অল্প বয়সের একজন পুরুষ সেহেতু আমার একটি নাম হতে পারে ছেলে বা পুরুষ। কিছু মানুষতো মাঝেমধ্যেই ছেলে বলেই ডাকেন। আমার একজন শিক্ষক প্রায়ই ডাকেন, এই ছেলে এদিকে এসো। এরপরে আমরা আমাদের মা-বাবার কাছে সন্তান, বাবামায়ের অন্য সন্তানের কাছে আমাদের নাম ভাই অথবা বোন, শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থী, কোনো প্রতিষ্ঠানে আমরা যখন কাজ করি বা করবো তখন আমাদের নাম কর্মি। আমি যেই মুহুর্তে এই প্রবন্ধটি লিখছি সেই মুহুর্তে আমার নাম লেখক এবং আপনারা যারা পড়ছেন তাঁদের নাম পাঠক। এইসব আমাদের দাপ্তরিক নাম না হলেও সমাজ দ্বারা স্বীকৃত; আমরা এই নামগুলোকে উপনাম বলতে পারি।। আশা করছি এই ক্ষুদ্র উদাহরণের পরে আর কারো মনে কোনো রকম প্রশ্ন থাকার কথা না যে পুলশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলা যাবে কি যাবে না। তবুও আলোচনার স্বার্থে একটু সামনে এগুতে চাই।

আমি মনে করি না মাঝে মাঝে, আলোচনার মাঝে কিংবা কথা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশকে দাপ্তরিক নামে না সম্বোধন করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলা হলে তা বাংলাদেশ পুলিশকে ছোটো করা হবে। বরং এটি আমার কাছে এক ধরণের স্বীকৃতির মতোই মনে হয়। মো. ইমরান আমহম্মেদ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন তাঁর লেখায়, সেটি হলো- দেশের গণমাধ্যম পুলিশের কোনো সাফল্যকে বর্ণনা করতে গিয়ে সেখানে ‘আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী’ টার্মের ব্যবহার করে থাকে কিন্তু পুলিশের কোনো সমালোচনা বা গিবত করার জন্য অথবা বিশেষ কোনো দোষ-ত্রুটি সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বরং ‘পুলিশ’এর ব্যবহারই দেখা যায়। আর তাতেই হয়ত তাঁর আক্ষেপ, ক্রেডিট কেন তাঁরা সরাসরি পাচ্ছেন না। তিনি ঠিক কথাগুলো এমন করে বলেছেন, 
“পুলিশ যদি ভালো কিছু করে, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান কিংবা মিডিয়া বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্য হিসেবে অভিহিত করে। আর নেতিবাচক কিংবা কাউকে দোষ দেয়ার মতো বিষয় হয়, সেক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠান কিংবা মিডিয়া ‘পুলিশ করেছে বা ‘পুলিশ দায়ী- এটা ঘটা করে প্রচার করে। সহজ কথায় বলতে গেলে, দোষ দেয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ নামটা আগে চলে আসে। ক্রেডিট দিতে হলে তা ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শব্দের মধ্যে হারিয়ে যায়। এ জন্য পত্রিকায় ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিচার্জ শব্দগুলো খুঁজে পাওয়া দায়, কিন্তু ‘পুলিশের লাঠিচার্জ’ শব্দযুগল শত শত বার পাওয়া যায়”।
এই কথাগুলো তিনি সত্য কি মিথ্যে বলেছেন তা যাচাই করার জন্য অনলাইন সার্চ ইঞ্জিন গুগলে খুঁজে দেখার জন্য অনুরোধ করেছেন। আমিও তাঁর অনুরোধ রাখলাম এবং কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর বুঝতে পারলাম নেতিবাচক বা ইতিবাচক কোনো বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গণমাধ্যমগুলো শিরোনামে পুলিশ অথবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লিখেন না বরং যখন যে প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় সম্পাদক যেটি ভালো মনে করেন তখন সেটি ব্যবহার করেন। তারমানে এ নয় যে, তিনি ঠিক বলেননি; যা বলেছেন তা অনেকটাই সত্য বলে ধরে নেয়া যায়।

তবে আমি মো. ইমরান আহম্মেদের ব্যাথিত হওয়ার কারণ সম্ভবত বুঝতে পেরেছি। যেমন- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ এর ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টার্মের ব্যাখ্যায় বলা আছে, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’’ বলিতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)সহ বাংলাদেশ পুলিশ, কোস্টগার্ড, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) সহ অনুরূপ আধা-সামরিক ও অসামরিক বাহিনীকে বুঝাইবে’। অর্থাৎ পুলিশ, র‍্যাব, কোস্টগার্ড, বিজিবি, আনসার, ভিডিপিসহ সবাইকেই এই নামে ডাকা যায় যার কারণে স্পষ্টভাবে এই টার্ম দ্বারা পুলিশিকে বোঝানো মুশকিল। যদিও মিস্টার আহম্মেদ এই বিশেষ দিক নিয়ে কিছুই বলেননি।

এই আলোচনা শেষ করার আগে আরেকটি বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার। গণমাধ্যমে প্রায়ই এরকম দেখা যায়, ২ জন পুলিশ অমুক কাজ করেছে, ৫ জন পুলিশ নিহত, ১০ জন পুলিশকে পুরস্কৃত করা হয়েছে ইত্যাদি। পুলিশের সংখ্যা ২ জন, ৫ জন বা ১০ জন এভাবে কি হাতে গুনে হিসাব করার মতো? কোনো দেশের পুলিশ বলতে সেই দেশের পুলিশের পুরো বডি, যেমন- বাংলাদেশ পুলিশ। গণমাধ্যমের এখানে একটু সচেতনভাবে হেডলাইন লেখা জরুরি। ২ জন পুলিশ না লিখে লেখা উচিৎ ২ জন পুলিশ সদস্য অথবা পুলিশে ওইসব সদস্যের পদ বিবেচনায় নিয়ে শিরোনাম বানানো।
মূল আলোচনায় ফেরা যাক। পুলিশ অনেক ধরনের কাজ করে যার বেশ কয়েকটি উল্লেখ করেছেন এই সহকারী পুলিশ সুপার যা পূর্বেই বলেছি। এর একটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, মামলার তদন্ত করে, সারাদেশের গোয়েন্দা তথ্যও সংগ্রহ করে, মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখন আপনাদের কি মনে হয়না মামলার তদন্ত করা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা, মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষারই অংশ?

জাগোনিউজ২৪'এ প্রকাশিত সহকারী পুলিশ সুপার মো. ইমরান আহম্মেদের মতামতের ওপর পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, পুলিশকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বললে কোনোভাবেই তাঁদের ছোটো করা হয় না এবং তাঁদের অবদানকেও অস্বীকার করা হয় না। তবে এই টার্ম ব্যবহার করে খবরের শিরোনাম বানানো কিছুকিছু ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত। তবে খবরগর্ভে বা আলোচনার নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে প্রতিবেদক বা আলোচক পুলিশ শব্দের রিপ্লেসমেন্টে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বললে সমস্যা হবার কথা না বা কারো এতে মন খারাপ করার কথা না, আমাদের শুধু একটু সচেতন ভাবে এই টার্মের ব্যবহার করতে হবে।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান
ফ্রিল্যান্স প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
ওয়েবসাইট: www.mizanurrmizan.info


রবিবার, মার্চ ১২, ২০২০।
Previous Post Next Post