ওরাই মালিক, ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে


গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বিচার ও দন্ড সম্পর্কে রক্ষণ নিয়ে ৩৫ (৫)-এ বলা আছে ‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না’। এখন কথা হলো কান ধরানো বা কান ধরিয়ে উঠবস কারানো কি
অমানুষিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ডের মধ্যে পরে না? আমি জানি কেউই বলবেন না যে, কান ধরিয়ে উঠবস করানো অমানুষিক, লাঞ্ছনাকর বা অসম্মানজনক নয়।

শুরুতেই সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ টেনে আনার কারণ এবার ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বই এখন করোনাভাইরাস মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিটি দেশকেই এখন বিশেষ এক পরিকল্পনা মাফিক চলতে হচ্ছে। প্রতিটি দেশের মানুষকেই এখন বাধ্য হয়েই কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে থাকতে হচ্ছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্দেশনা অনুযায়ী বেশ কিছু স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হচ্ছে। বাংলাদেশে সরকারি নির্দেশনা অনুসারে বেশ কিছুদিন ধরেই বাইরে বের হচ্ছেনা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া। আসলে এটি সরকারি নির্দেশনা বলেই শুধু নয়, মানুষ জানে করোনাভাইরাসের মতো মহামারীকে ঠেকাতে গেলে বা নির্মূল করতে গেলে এই মুহুর্তে নিজেদের মতো করে নিরাপদ স্থানে থাকার বিকল্প নেই কারণ আমরা কেউই জানিনা ভাইরাস কোথায়, কার শরীরে, কোন বস্তুতে এবং কী অবস্থায় আছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই মহলে ও সমাজে একটু মেপে চলছে। আমরা কি এর প্রশংসা না করে থাকতে পারি?

বেশিরভাগ মানুষই যখন ঘরে থাকছে বা একরকম কোয়ারেনটিন মেনে চলছে তখন দেখে থাকি, কিছু মানুষ বাইরে বের হচ্ছেনই। গুটিকয়েক অসচেতন বা অবচেতন মানুষকে বাদ দিলে দেখা যাবে সচেতনদের বড়ো অংশই আসলে বের হতে বাধ্য হচ্ছেন। আপনি হয়ত ভেবে থাকতে পারেন, চাল-ডাল-নুন কেনার জন্য বের হতেই পারেন একেকজন; আপনার হয়ত মাথায়ই নেই যে, পেশার প্রয়োজনেও দিনভর পরিশ্রম করার জন্য ঘরের বাইরে বের হন এবং নিজের কাজ করেন। এ কথা যখন বলেছি তখন ডাক্তার, সাংবাদিক বা বিভিন্ন বাজারের বিক্রেতাদের কথা আপনার স্মরণে চলে আসবে আমার বিশ্বাস। এই যে তিনটি শ্রেণির কথা আপনি মনে এনেছেন বা আমি লিখেছি, এঁদের বাইরেও কিন্তু আরো এক প্রকারের মানুষ রয়েছেন যারা একদিন বাইরে বের না হতে পারলে ওইদিন দুমুঠো খেতে পারেন না, সাথে রয়েছে তাঁদের পরিবার।

গত দুই-তিনদিন সোশ্যাল নেটওয়ার্কের সাথে ছিলাম না, বলা যায় ইন্টারনেটের সাথেই ছিলাম না। একটু পড়শোনা নিয়ে ছিলাম। কিন্তু ২৮ মার্চ যখনই ফেসবুকে লগইন করলাম তখন বেশ কিছু মানুষের পাঠানো বার্তা আমার চোখ আটকায়। এর মধ্যে আমার একজন শিক্ষকের বার্তাও রয়েছে। তিনি আমাকে যশোরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমার নজরে নিয়ে আসেন। এবং এই বার্তায় তিনি যা লিখেছেন সেটি আমি এখানে উল্লেখ করছি না, তবে অন্তত এটি বুঝতে পারছি একজন মানষ কোনো কিছুতে কতটা কষ্ট পেলে তবে এমন একটি বার্তা পাঠাতে পারেন। ওটা কোনো ঘটনা নয়, বরং একজন সরকারি কর্মচারীর দেশের সাথে এবং দেশের মালিকের সাথে দুর্ব্যবহারই বলব।

যদিও ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছেন তবুও আলোচনার প্রেক্ষিতে একটু বলে নিচ্ছি- চলতি মহামারী করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করছে সরকার এবং এই যুদ্ধটি মূলত ‘ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন’ এই স্লোগান ও নীতির ওপর ভর করে চলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রচলিত ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮’ তো রয়েছেই। কিন্তু কিছু মানুষ সব সময়ই থাকে যারা স্রোতের উল্টো দিকে হাঁটতে পছন্দ করেন, কখনো তা হয় সচেতনতার অভাবে বা অজ্ঞতার কারণে, আবার কখনও চারিত্রিক দোষের কারণে। যাইহোক, যে যুদ্ধ সরকার ঘোষণা করেছে তাতে জয়লাভ ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা খোলা নেই। এবং একে সফল করার জন্য জায়গায় জায়গায় মোবাইল কোর্ট বসানো হচ্ছে, কোনো অপরাধী পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বা দণ্ড প্রদান করা হচ্ছে।

২৭ মার্চ যশোরের মণিরামপুরে ঠিক এই সুন্দর ও সময়োপযোগী দায়িত্ব পালন করছিলেন সেখানের এসিল্যান্ড সাইয়েমা হাসান। সরকারের একটু উঁচু মাপের মহিলা কর্মচারী তাঁর নেতৃত্বে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে জারি করা অবরুদ্ধ পরিস্থিতি তদারকি করতে যান। আমি ঠিক জানিনা ওটা মোবাইল কোর্ট ছিলো কিনা, ওই সময় তিনি তিন-চারজন বৃদ্ধকে কান ধরে দাঁড়া করে রেখেছেন এবং তার ছবি তিনি নিজের মুঠোফোনেও বন্দী করেছেন। ওই বৃদ্ধ তিনজনের অপরাধ ছিলো তাঁরা মাস্ক না পরেই বাইরে নেমেছেন এবং নিজেদের কর্ম করছেন; এরা কেউ দিনমজুর ও রিক্সা-ভ্যানচালক। যদি ওটা মোবাইল কোর্ট না হয়ে থাকে তাহলে সাইয়েমা হাসান নাগরিকদের শাস্তি দিয়েছেন কীভাবে আর যদি মোবাইল কোর্ট হয়ে থাকে তাহলে আমরা সাধারণ মানুষেরা ধরে নিতে পারি এই সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর দেশের সংবিধান ও অন্যান্য আইন সম্পর্কে নুন্যতম ধারণা নেই; কিন্তু এ সম্পর্কে ধারনা না থাকলে এতদূর আসেন কেমন করে? তবে কি দেশের সংবিধান ও অন্যসব প্রচলিত আইন ও বিধি বিধান তিনি পরোয়া করেন না? যে শাস্তি তিনি প্রয়োগ করলেন তা নিয়ে নিয়ে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এ ও বলা নেই। যা বলা আছে তা অনেকটা এরকম, কেউ যদি অপরাধী সাব্যাস্ত হয় তাহলে তাকে অর্থদণ্ডে অথবা কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে অপরাধ অনুযায়ী তবে সেক্ষত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার আগে অন্তত সংবিধান এবং মোবাইল কোর্ট আইনে দণ্ড প্রদান ও সংরক্ষণ নিয়ে যেসব বলা আছে সেগুলো একটু তাঁর দেখা উচিৎ ছিলো না? এই বিসিএস পাশ কর্মচারী দেশের নাগরিককে লাঞ্ছনা করে যে ছবি তিনি তাঁর মুঠোফোনে ধারণ করেছেন, সেটি কি অপরাধ নয়? আর যারা এই ছবি সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আপলোড করেছেন ভুক্তভুগিদের চেহারা উজ্জ্বল রেখে তাঁরাও কি শাস্তির উপযুক্ত নয়? এক্ষেত্রে  ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর ধারা ২৬ বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

মানুষ কথায় কথায় আবেগ, মানবিকতা ও মূল্যবোধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন যা আইনের চেয়েও অনেক বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে যা আমার এড়িয় যাওয়ার সুযোগ নেই। যাদেরকে অন্যায়ভাবে কানে ধরানো হলো  তাঁরা দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিক। শুধু সরকারের একজন কর্মচারী হয়ে কীভাবে একজন বয়ঃকনিষ্ঠ নাগরিক একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিককে অপমান-অপদস্থ করতে পারেন? এই অপমান কি মাত্র ওই তিন-চারজন বয়োবৃদ্ধকে করা হয়েছে? না, এই সাধারণ কর্মচারী অপমান করেছেন দেশকে, অপমার করেছেন পুরো জাতিকে, অপমান করেছেন দেশের মালিকদের।

বিষয়টি প্রশাসনের কানে যাওয়ার সাথে সাথেই তাৎক্ষণিকভাবে সাইয়েমা হাসানকে মণিরামপুর থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে, এই সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি একটি প্রতিনিধি দল গিয়ে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলেছেন, খোঁজ খবর নিয়েছেন ও কিছু সাহাজ্য করেছেন। কিন্তু এই বিসিএস পাশ কর্মচারীর এমন একটি শাস্তি হোক যা উদাহরণ হয়ে থাকবে এবং কেউ শুধু ক্ষমতার জোরে যা ইচ্ছে তাই করে যেতে নিরুৎসাহিত হবে। শুনেছি এ ব্যাপারে কোনো একজন আইনজীবী মামলার প্রস্ততি নিচ্ছেন বা নিয়েছেন।

শেষের দিকে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি উক্তি উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি যা তিনি উচ্চারণ করেছিলেন ২৬ মার্চ, ১৯৭৫ তারিখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ প্রদানের সময়- ‘সরকারি কর্মচারীদের বলি, মনে রেখো, এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনি নয়। পাকিস্তানের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে, তার চেহারাটা তোমার বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো। ওদের পরিশ্রমের পয়সায় তুমি মাইনে পাও। ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ, ওরা নিজেরা কামাই করে খায়। আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ঐ গরিব কৃষক। আপনার মাইনে দেয় ঐ গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে’।


মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info
Previous Post Next Post