স্মৃতিকথা: নিষ্পাপ চুরি

সেদিন থেকে আজ এক যুগ পার হয়ে গেছে। দুটি কি তিনটি বছর বেশি হলেও হতে পারে। এক্স্যাক্ট হিসাবটা দিতে পারব না। তখন কোন ক্লাসে পড়তাম, সেটা ঠিক করে মনে করতে পারলেও বলে দিতে পারতাম। তবে কী হয়েছিল সেদিন, তা মনে আছে। স্মৃতি আসলে এমনই; কিছু ফেলে দেয় আর কিছু রেখে দেয়। বাড়িতে ছিলাম আমি আর ফুপি। অন্যরা গেছে বেড়াতে। ফুপির থাকার কারণ, তার কী যেন একটা পরীক্ষা চলছিল। আর আমার থাকার কারণ,
রাতের বেলা সে একা থাকতে পারবে না। ভূতের ভয়, ভালো লাগবে না। তাই পড়ার চাপ না থাকা সত্ত্বেও থাকতে হলো।

রাত নয়টার দিকে ফুপি পড়তে ছিল, তার টেবিলেই জ্যামিতি বক্সের সরঞ্জাম নিয়ে নিজের মতো করে আঁকিবুঁকি করতে ছিলাম, ক্যালকুলেটর চাপছিলাম আর দুষ্টু বুদ্ধি আঁটতে থাকি—আমার জ্যামিতি বক্স আর ক্যালকুলেটর ফুপির থেকে বদলে নেব। তারগুলো আমার চেয়ে অনেক সুন্দর ছিল। সেদিন যদি আজকের মতো স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের নাগালে থাকত, তবে বোধ হয় এ রকম ভাবনাটা আসত না। তখন এগুলো নিয়েই থাকতাম। যেহেতু বাড়ি ফাঁকা ছিল, শাসানোর মতো কেউ নেই।



দরজায় ধাপ ধাপ করে কে যেন আঘাত করল। হাতের পাঁচ আঙুল মেলে ধরে দরজায় আঘাত করলে ভেতর থেকে যেমন শোনা যায়। খুলে দেখি রিপন কাকা। ঢুকে সোজা ফুপির পড়ার জায়গায় গিয়ে জানতে চাইল, ‘কী খবর আপু? কাজটা কী হবে?’ ‘আরে তুই ভাবিস না। নাসরীন বলেছে, ওদের ঘরে বিশাল একটা দড়ি আছে। ওটা নিয়ে একটু পরেই চলে আসবে। তুই রুবেলকে বলে ভালো একটা দা জোগাড় করতে বল।’ ফুপি রিপন কাকাকে বলে দিল। কথা হতে না হতেই নাসরীন আন্টি চলে এল। আমার মাথায় হালকা ঠুনকি দিয়ে বলে, এটা আছে কী করতে? না পারবে গাছে উঠতে, না পারবে কাটতে। শুধু খাওয়ায় ওস্তাদ। আমি নীরবে সহ্য করলাম। না সহ্য করে উপায়ও নেই। প্রথমত, গাছে উঠতে জানি না। দ্বিতীয়ত, তার সঙ্গে তর্ক মানেই পিঠের ওপর দু-চারটা রসিক পোশাকি কিল-চাপড়।


রুবেল চলে আসার পরই আমাদের মূল কাজের পর্ব শুরু হলো। দুটি দা, একটি কাস্তে আর নাসরীন আন্টির দড়ি নিয়ে রিপন কাকা আর রুবেল আমাদের পেছনের দরজা দিয়ে বেরোল। আমি ছোট্ট একটি লাইট নিয়ে অনুসরণ করলাম। টার্গেট নাসরীনদের বড় গাছটা, রিপন-রুবেলদের পশ্চিম পাড়ের গাছ আর আমাদের একটা। এ তো নিজেদেরই গাছ, তাহলে রাতের বেলায় এসব চুপিচুপি কেন করছি? দিনের আলোতে বা প্রকাশ্যেই সম্ভব!

আসলে আমরা শুনেছি যে কারও গাছের ফল যদি রাতের আঁধারে চুরি করে কেউ খায়, তাহলে নাকি ফলন শেষ হয়ে যায়। এটি জানার জন্যই। এটা তো গেল একটা দিক। অন্যদিকে গাছের মূল অভিভাবকেরা কোনোমতেই আমাদের দশ-বারোটা ডাব-নারিকেল পাড়তে দেবেন না। এই প্রস্তাব তাঁদের কানে গেলে আমাদের বাড়িছাড়া করবেন। প্রথমে গেলাম নাসরীনদেরটার কাছে। রিপন কাকা বলে, রুবেল তুই গাছে ওঠ, আমার বুকে ব্যথা। ওরা দুই ভাই। খুবই মিল আবার দুচোখেও একে অপরকে দেখতে পারে না। রুবেল কাছা মেরে দড়ি আর কাস্তে নিয়ে উঠে পড়ে। দড়িখানা গলায় ঝুলিয়ে, কাস্তেটা গাছে কোপ দিয়ে দিয়ে উঠে গেল। কিছুক্ষণ পর শুনি ঘচঘচ আওয়াজ হচ্ছে। বুঝলাম পিড়ের গোড়ায় কাস্তে চালাচ্ছে। কাটা শেষে দড়ি দিয়ে বেঁধে আস্তে আস্তে নিচে ফেলল। গুনে দেখলাম সাতটি নারিকেল। অনেকটা কচি। ডাব বলা যাবে না। ফিসফিস করে গাছেরজনকে জানিয়ে দেওয়া হলো, আমরা চলে যাচ্ছি আর ও যেন ঠান্ডা মাথায় নেমে আসে। হঠাৎ আমাদের উপস্থিতি লক্ষ করে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করে দিল। আমরা তো ভয়ে দিলাম দৌড়। আর ওই রুবেলটা কী করেছে সেটা ও-ই ভালো বলতে পারবে। তবে আমাদের চেয়ে ওর ভয়ের মাত্রাটা যে বেশি ছিল, সেটা বুঝতে বাকি থাকেনি। হলফ করে বলতে পারি, আজ এই কুকুরকাণ্ডের বিপরীত নারকেলগাছের ডগায় এ কাজে অনভিজ্ঞ কেউ থাকলে নির্ঘাত ধুপ করে পড়ে হাত-পা ভাঙত। আমরা ওগুলো ঘরে রাখতে না রাখতেই হাঁপাতে হাঁপাতে রুবেলও চলে আসে। আমাকে আক্ষেপ করে বলে, বেটা তুই দৌড়ালি ক্যা? রিপন ভাই জিনিসটা দুহাতে ধরে নিয়ে আসত আর তুই লাইটটা নিয়ে দাঁড়াতিস? ওর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচটা দেখিয়ে বলে, দেখ দেখ, পেছনের লেবুগাছটার কাছে পড়ে গিয়ে কী অবস্থা হয়েছে। ফুপি স্যাভলন আর তুলা দিল, বাকিটা নিজেই সেরেছে। রিপন আর নাসরীন কাটাকুটি শুরু করে দিল। তবে রুবেলটার পায়ে ব্যথার কারণে রিপন কাকাকেই যেতে হলো পশ্চিমপাড়ে। এ যাত্রা কোনো অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটেনি। ওদের গাছ থেকে পাড়া হলো আরও ছয়টি। মোট তেরোটি। আছি পাঁচজন। গড়ে যাতে তিনটা করে একেকজন পেতে পারি, তাই আমাদের গাছ থেকে দুটি পাড়তে বলা হলো। কিন্তু আমি বলে উঠি, না দুটি না, পাড়লে তিনটি পাড়া হোক। একটি রুবেলকে দিয়ে দেব। রিপন-রুবেলদের পশ্চিম পাড়ের গাছ থেকে যে ছয়টা পাড়া হয়েছিল, ওই ছয়টা পুরোই ডাব। ফুপি বলে, সবাই শোন; আগে শক্তগুলো খাওয়ার পরে ডাব খাব। শেষে ডাব খেলে পাপ হবে না। পাপ শব্দটা শুনে কিছুটা ভড়কে গেলাম প্রত্যেকে। ধর্মের প্রতি একটু আমরা দুর্বল, তাই। নারকেলের শাঁসে কচ করে একটা কামড় দিচ্ছি আর একে অপরের দিকে তাকাচ্ছি। সবারই যে একই চিন্তা, তা কপাল আর ঠোঁটই বলে দিচ্ছে। পাপের দিকে নজর না দিয়ে খাওয়া শুরু করে দিলাম। গল্প, ঠাট্টা তো হয়েছেই।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই শুনি কারা যেন নারকেল খেয়ে পাশের ধানখেতে ছোবড়া ফেলে গেছে। নাসরীন আন্টির মা নিজেদের গাছের দিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করলেন যে তাঁদের গাছ থেকেই চুরি করা হয়েছে। তাঁর সন্দেহ, কাল রাতে যখন কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠেছে, তখনই কাজটা হয়েছে। বাইরে না গিয়েই ভুল করেছেন। অন্য দিক থেকে চিল্লানি দিয়ে বলে, তার নতুন গাছের ডাব চুরি হয়েছে। আর ফুপি তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, আমাদেরও তো একটা পিড় নেই। বাড়িতে হইহই কাণ্ড লেগে গেল। এর মধ্যেই তিনমাথা গোছের একজন বলে উঠল, যা হয়েছে তো হয়েছেই। এখন বলো, যারা খেয়েছে তারা যেন গাছের গোড়ায় মাটি ফেলে যায়। ওদেরও পাপ থাকবে না, ফলনও হবে। সুযোগটি নিয়ে চুরিটা নিষ্পাপ করে নিলাম আমরা।



মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info

(এই লেখাটি ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত)
ছবি: safran98Pixabay
Previous Post Next Post