মুভি রিভিউ: আলিনগরের গোলকধাঁধা



সিনেমা নিয়ে আগে কখনো লিখিনি বা লেখার সুযোগ হয়নি যেহেতু আমি খুব একটা সিনেমা দেখতাম না আর দেখলেও মাঝেমধ্যে টিভির পর্দায় দু’একটা প্রেমের ঝাঁকুনি খাওয়া লেবেলের সিনেমা দেখা হতো। কিন্তু ওসব নিয়ে কি বা লেখার আছে বলুন। সেই গলা চেঁচিয়ে দু’চারটে সংলাপ আর নায়ক নায়িকার দুলুনি আর লাফালাফি। তবে আজকাল কেমন যেন সিনেমার নেশায় পড়ে গেছি। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সায়ন্তন ঘোষাল, সৃজিত মুখার্জি, মৈনাক ভৌমিক কিংবা নন্দিতা-শিবপ্রসাদ বা এঁদের মতো যারা রয়েছেন তাঁদের সিনেমা আমার ভালো লাগে।

সম্প্রতি ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’ (The Maze of Alinagar) নামের একটি সিনেমা দেখেছি যেটি পরিচালনা করেছেন সায়ন্তন ঘোষাল এবং মুক্তি পেয়েছিল এপ্রিল ২০, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে। তবে আমার দেখার সুযোগ হয় এই লেখাটি সেদিন লিখছি (এপ্রিল ১৪, ২০২০ খিস্টাব্দ) তার বেশ কয়েকদিন আগে।

অনির্বান ভট্টাচার্য ও পার্ণো জুটির অভিনয় করা এই সিনেমাটি মূলত একটি মিস্ট্রি থ্রিলার যার গল্প সাজানো হয়েছে ইতিহাসকে আশ্রয় করে তবে এ কোনো ঐতিহাসিক সিনেমা নয়। আমরা প্রত্যেকেই জানি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ইংরেজদের মধ্যে সংগঠিত পলাশীর যুদ্ধের কথা। এর আগে যখন বাংলা, বিহার ও ওড়িশ্যার নবাব সিরাজ ইংরেজদের নাস্তানাবুদ করে কলকাতার দখল নিয়ে তার নাম দিয়েছিলেন তাঁর নানা আলবর্দি খানের নামে আলিনগর। অর্থাৎ এ গল্প ভারতের কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করেই। আর গল্পে যে গোলকধাঁধা এবং সে ধাঁধার উত্তর খোঁজা ও পরিণতি দেখানো হয়ে সে এক অতি মূল্যবান বস্তু যা ইতিহাসের এক বিশেষ গুরুত্ব ধারণ করে আছে।

সায়ন্তন ঘোষালের এই ছবির গল্প ও চিত্রনাট্য লেখেন সৌগত বসু। অনির্বান ভট্টাচার্যকে সোহম এবং পার্ণো মিত্রকে বৃষ্টি চরিত্রে পাওয়া যায় কলকাতার পথে ঘাটে ধাঁধা ভাঙানোর গল্পে। সোহম খুব মেধাবী একটি ছেলে যার কিনা বাংলা ও বাংলা ইতিহাস নিয়ে খুব আগ্রহ এবং এ নিয়ে সে গবেষণা করে। আর বৃষ্টি হলো খুব চঞ্চল বা উত্তাল কিসিমের এক মেয়ে তবে দায়িত্ববোধ সম্পন্ন। এই মেয়েটি শহরের বনেদি পরিবারের সন্তান যাদের মূল খুজতে গেলে হয়ত সেই নবাব কিংবা জমিদারদের রক্ত পর্যন্ত পৌছাবে। এই বৃষ্টি আবার সোহমের বান্ধবী বা প্রেমিকা। ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’ সিনেমায় রোম্যান্টিসিজম রয়েছে কিন্তু গতানুগতিক যে কমার্শিয়াল বা একটু রগরগে আর্টফিল্মে যে প্রেম দেখানো হয় সেই বিরক্তিকর জিনিসটি এখানে নেই।

এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ন দুটি চরিত্রে রয়েছেন পরাণ বন্দোপাধ্যায় এবং কৌশিক সেন। কিন্তু অল্প হলেও ত্রিবিক্রম ঘোষের করা সোমনাথ চরিত্রই সবার মনে গেঁথে থাকবে।
সিনেমায় সেই অতি মূল্যবান বস্তু, বিভিন্ন লোকের কাছে ছড়িয়ে থাকা ধাঁধাযুক্ত চিরকুট, আশুতোষের (কৌশিক সেন) কাছে পলাশীর যুদ্ধ সম্পর্কিত বিভিন্ন পরিণতি নিয়ে লেখা চিরকুট, সাক্ষীগোপালের (পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) অভিব্যাক্তি, সোহমের ধাঁধার উত্তর খোঁজা, গল্পের ভাঁজে ভাঁজে সোহমকে বৃষ্টির সহায়তা ও চঞ্চল স্বভাব, একের পর এক খুন এবং ২৭ বছর আগে মৃত্যু বা খুন হওয়া আশুতোষের গবেষক বন্ধুর ছায়া বিশেষ ফিরে আসাসহ ইত্যাদি নিয়ে এক আলাদ রকম রোমাঞ্চকর কিছু সময় উপহার দেয়।

আরও অনেক কিছু তুলে আনা যায় এই লেখাটিতে কিন্তু সিনেমাটি এখন পর্যন্ত যারা দেখেননি তাঁদের কথা চিন্তা করে বেশি কিছু লেখা উচিৎ হবে না কারণ আপনারা সবাই জানেন। তবে গল্প ও চিত্রনাট্যের সাথে মিল রেখে পুরোনো শহরের সরু অলিগলির যে চিত্র দেখানো হয়েছে তা একরকম পুরোনো ঢাকাকে আমার সামনে নিয়ে আসে। আসলে আমি কলকাতা শহর দেখিনি তাই যখন খুব সরু গলি পর্দায় এসেছে তখন মনে হয়েছিল এ বোধহয় বাংলাদেশের পুরাণ ঢাকা। এছাড়া রহস্যময়ী শহরে রহস্যের সিনেমার প্রয়োজনে রহস্যময়ী স্থানের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার আমার ভালো লেগেছে। ক্যমেরার ক্লোজ শট, লং শট, রোলিং কিংবা ড্রোন শটে নেয়া চিত্রগুলোর সম্পাদনা খুব চমৎকার ছিলো। ব্যকগ্রাউন্ড স্কোর বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও ছিলো সিনেমার উপযোগী তবে বলছিনা বেশি আকর্ষণ জাগিয়েছিল। দেবাঞ্জলির কন্ঠে মিমোর কম্পোজিশনে শহরের অলিগলি গানটি আমাকে এক অন্যরকম অনুভূতির যোগান দেয় যা বলে বা লিখে প্রকাশ করার মতো না হলে বলতে পারি গানটির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। রুপম ইসলামের গলায় ইতিহাস কবিতা গানটিও মানানসই ছিল, এটিরও কম্পোজার ওই মিমো। গানদুটি যৌথভাবে লিখছেন প্রিয়া চক্রবর্তি এবং প্রান্তিক চক্রবর্তি।

সোহম আর বৃষ্টির পায়ে পায়ে  আমার মতোই দর্শক ঘুরে বেড়িয়েছেন রহস্যের গন্ধে নিঃসন্দেহে এবং বিশেষ কিছু মুহুর্তে বেশ কিছু খুন হতে দেখে আরও রহস্যের আশায় থেকেছেন। কিন্তু রহস্য তার গণ্ডি পেরিয়ে বের হতে পারেনি বরং মনে হয়েছে যতটা সহজে ধাঁধাঁর উত্তর বের করে গল্পের ইতি টানা যায় সে চেষ্টা করে গেছেন লেখক-চিত্রনাট্যকর ও পরিচালক। এই রহস্যের সিনেমায় রহস্য বলতে শুধু ধাঁধার রহস্য ছাড়া আরেকটি বিশেষ রহস্য ছিল যে রহস্য বের করার সিনেমাটি দেখা জরুরি; এর বাইরে কোনো রকম থ্রিল্ড কিছু পাওয়া যায়নি। অনির্বান ভট্টাচার্য, পার্ণো মিত্র, কৌশিক সেন, পরাণ বন্দোপাধ্যের উপস্থিতি ও অভিনয় খুবই ভালো হলেও গোবিন্দ হালদারের আমিরচাঁদ চরিত্রটি ভালো লাগেনি। আমি বলতে পারি এখানে আমিরচাঁদ চরিত্রের জন্য গোবিন্দ হালদার ছিল ভুল কাস্টিং। পাশাপাশি গোয়েন্দা হিসেবে পূজারিণীকে ভালো করে সাজাতে পারেন নি পরিচালক। কিংবা মার মনে হয়েছে এই সিনেমার শুরু থেকে মাঝখান পর্যন্ত যেমন ছিল তার থেকে খুব ঢিলেঢালা ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে শেষভাগ। এই বেশ কয়েকটি দুর্বল দিক ছাড়া বাকি সবই আমার কাছে ভালো লেগেছে।

মাঝে মধ্যেই সোহমের জবান থেকে বের হওয়া নবাবী আমলের বেশ কিছু ইতিহাসখণ্ড তরুণদের মনে সেই আমল সম্পর্কে আগ্রহ জাগাবে বলে আমার বিশ্বাস। এরকম সিনেমা আমি আরো দেখতে চাই কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয় এই রকম সিনেমা আমাদের বাংলাদেশে তৈরি হয়না। আর ভারতে বানানো এই মানের ভালো ভালো সিনেমাগুলো আমাদের দেখতে হয় ইন্টারনেটের সাহাজ্য নিয়ে।

বেশিরভাগ পর্যালোচক যখন কোনো কিছু যেমন বই বা সিনেমা নিয়ে পর্যালোচনা করে থাকেন তখন একটি রেটিং দিয়ে থাকেন। কিন্তু আমি ওসবের মধ্যে নেই, রেটিঙয়ে বিশ্বাসও করিনা। আমার যা বলার তা বলে দিয়েছি। আপাতত প্রথম ধাঁধার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করুন-
সেই পথের ঠিকানা স্ত্রী যেথা সাজে,
ভুতুম পেঁচার টিকি যত শোকেসে বিরাজে।
পাবে হদিস সেইখানেতেই খোঁজো নিরন্তর,
হেস্টিংসের প্রত্যাঘাত পাঁচ-আট-পঁচাত্তর।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান, বাংলাদেশ
Previous Post Next Post