অসুর মুভি রিভিউ: এ এক বাজে গল্পের সিনেমা


Asur Movie Poster
অসুর, আমার দেখা  ভিন্ন ধরণের একটি সিনেমা। যে ধরণের সিনেমা দেখে আমি অভ্যস্ত সে থেকে অনেক দূরের সিনেমা পাভেল পরিচালিত অসুর। কারো জীবন বা ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত না হলে সিনেমা কিংবা নাটক বা অন্য যেকোনো ফিকশনের ক্ষেত্রে একটি কথা প্রযোজ্য, সেটি হলো–‘কাহিনী বা গল্পের সাথে বস্তবের কোনো মিল নেই’। কিন্তু জীবন ঘনিষ্ঠ ছবি বানানোর পর যদি বলা হয় এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই তাহলে সেটি মেনে নেয়া কষ্টের। যদিও মেকাররা একটু ঘুরিয়ে বলেন, বাস্তবের কোনো চরিত্রের সাথে মিল নেই বা তা থাকলেও কাকতালীয়।

পাভেলের এ অসুর আমার একদিকে যেমন অনেকটা ভালো লেগেছে, আবার অপরদিকে শতভাগই ভালো লাগেনি। সিনেমাতে শিল্পিদের অভিনয় বিশেষ করে প্রধান প্রধান চরিত্রগুলোতে থাকা জিৎ, আবীর চট্টোপাধ্যায় ও নুসরাত জাহানের অভিনয় ও পাভেলের পাশ করে যাওয়া পরিচালনা আমার ভালো না লেগে উপায় নেই। কিন্তু ভালো লাগেনি গল্প, স্ক্রিনপ্লে এবং বেশ কিছু খণ্ডাংশ।

গল্পে দেখানো হয়েছে প্রধান ও কেন্দ্রিয় চরিত্রে আছে কিগান মান্ডি নামের এক শিল্প কলার শিক্ষক। যে এ পৃথিবীর অনেক কিছু সম্পর্কেই উদাসীন। যে কিনা সব সময় পাগলের বেশে থাকে, ক্লাসে প্রবেশ করে অর্ধনগ্ন অবস্থায়, নেশা করে মাতাল থাকতে পছন্দ করে, গোছল করেনা বরং গায়ে গন্ধ নিয়ে থাকাটাই যেন তার পছন্দ। কিগানের কল্পনায় প্রায়ই উঠে আসে এক রহস্যময়ী নারী। যে নারীর কথা ভেবেই সে তার বন্ধুর সাথে মাতাল অবস্থায় যৌনকর্মে লিপ্ত হয়। শুধু এতটুকুই নয় এই চরিত্রটি তার এক ছাত্রীর সাথে এক রিক্সাওয়ালাকে পর্যন্ত নগ্নশরীরে অভিনয় করিয়েছে। পরে এই চরিত্রেরই মুখে শোনা সে তার সহকর্মি ও শিক্ষার্থীদের প্রায়ই এমন করে নগ্ন করে। আবার অপরদিকে ধর্মের ডাক। এ যেন এক পুরো ভণ্ড চরিত্র নিয়ে এসেছেন পাভেল। ভাগ্য ভালো এ সিনেমার পরিচালক সৃজিত মুখার্জি নন।

কিগান মান্ডি চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন জিৎ। চরিত্রের যা চাহিদা ছিল তিনি তা পূরণ করেছেন। তবে কিছু জায়গায় খাপছাড়া লাগলেও এই প্রথমবারের মতো নায়ক জিৎ নয়, দেখেছি অভিনেতা জিৎকে।

নুসরাত জাহান প্লে করেছেন অদিতি চরিত্র। নুসরাতের অভিনিত আর দশটি সিনেমা থেকে অসুরে অত্যন্ত ভালো অভিনয় করেছেন। এই অদিতি চরিত্রটি হলো কিগান মান্ডির ফিমেল ও আপডেটেড ভার্শন। অর্থাৎ কিগান যেখানে নোংরা থাকতে ও নেশদ্রব্য নিতে পছন্দ করে সেখানে অদিতি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও নেশা থেকে দূরে থাকে তবে আত্মিকভাবে কিগান ও অদিতি দুটোই এক। অদিতি নানাভাবে কিগানকে প্রশ্রয় দেয় যা এখানে দেখানো হয়েছে শিল্পের মর্যাদা বলে। এই অদিতি তার এক বন্ধুকে বিয়ে করে কিন্তু মন পড়ে থাকে কিগান পাগলের কাছে এবং একটা সময় ডিভোর্স এর দিকে যায় অদিতির দাম্পত্য জীবন। অশ্যকর চরিত্র এ অদিতি।

কিগান ও অদিতিকে নিয়ে বলার পর বাকি থাকলো বোধি নামের আরেকটি চরিত্র। এখানে রয়েছেন আবীর। ওই বলেছি অদিতি তার বন্ধুকে বিয়ে করেছে কিন্তু সে সম্পর্কে টিকে থাকেনি কিগানের জন্য। বোধি হলো সে বন্ধু। মার কাছে এই বোধিকেই একমাত্র সুস্থ্য ও স্বাভাবিক মনে হয়েছে। যার মধ্যে খুঁজে পেয়েছি প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, দায়িত্ববোধ, রাগ, হিংসা, আত্মপ্রতিষ্ঠার মনোভাব ইত্যাদি। আপনি যদি সিনেমাটি দেখে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই মনে হবে এই বোধি আমাদের চারপাশে যারা ঘুরছে তাঁদেরই কারো না কারো প্রতিনিধিত্ব করছে। এবং বোধি হিসেবে আবীর ছিলেন পারফেক্ট কাস্টিং।

এই সিনেমা যখন বাজারে চলছিল অর্থাৎ মুক্তি পেয়ছিল সিনেমা হলে তখন পাভেল একটি অভিযোগ করেছিলেন। তা হলো কোন সাংবাদিক নাকি রিভিউ করতে গিয়ে সিনেমার গল্প বলে দিয়েছেন যা তাঁর পছন্দ হয়নি। আমিও এই তিন চরিত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেকটা বাতাস দিয়ে ফেলেছি। পাভেল কি এখানেও রাগ করবেন? করার কথা না কারণ ওই সিনেমাতো আর এখন প্রেক্ষাগৃহে চলবে না। তাছাড়া এখনো যারা অসুর দেখেননি তাঁদের বলছি আমি শুধু ট্রেলারটিই বললাম। আরও অসভ্যতা পাবেন সিনেমায়। ভদ্রভাবেও যে অসভ্যতার চিত্র ইতিবাচকভাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় সে অনেকটাই বোঝার বাইরে থাকবে অনেকের যদি সে জিৎ ফিল্ম ওয়ার্কজ’এর এ সিনেমা না দেখেন।

কোনো রকমের চুমাচামি বা রগরগে যৌন দৃশ্য দেখানো হয়নি অসুর সিনেমাতে কিন্তু আমি একে ভদ্রলোকের গল্প বলতে পারি না। দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে শিল্প ও শিল্পের প্রতি সম্মান, অবশ্য তা ব্যর্থ হয়েছে। আমি যতটুকু বুঝি তাতে শিল্পি বাঁচে তাঁর শিল্পের দ্বারা, এখানেও তা-ই দেখাতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু হয়ে গেছে অন্য কিছু। শিল্পের চেয়ে বরং শিল্পিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলা হয়েছে। একদম শেষ বলা হয়- “কিছু মানুষ সময়ের আগে দেখতে পান, কিন্তু আমরা তাঁদের বুঝতে পারিনা, পাগল বলি। কিন্তু ইতিহাসের ধারায় সে পাগলামি নতুন চিন্তার জন্ম দেয়”। এ কথাটি ফেলে দেয়ার মতো নয়। কিন্তু এ উক্তি এ সিনেমায় কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট বহন বা ধারণ করে না। আরেকটি আছে; টিজারে দেখে থাকবেন কিগান বলছে “পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো দুর্গা”। অনেকেই ভেবেছিলেন এ বোধহয় দেবতা হিসেবে বা আধ্যাত্মিক কোনো বানী ছিল এটি কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় এই বড়ো সেই বড়ো নয়। দুর্গা বড়ো হলো এর উচ্চতা বিচারে, ওইযে শিল্প ও শিল্পের  ব্যর্থ বন্দনা!

এ নিয়ে আর খুব বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। আমি এ পর্যন্ত যে কয়টি রিভিউ করেছি সেসবের মধ্যে একটি খাপছাড়া রিভিউ হলো অসুর মুভি রিভিউ। হ-য-ব-র-ল এক সিনেমা এই অসুর সিনেমা। বাজে গল্পের সিনেমা এ অসুর সিনেমা।

আমি শুধু পেয়েছি পরিচালক পাভেল ও অভিনয়। এর বাইরে আর কিছুই পাইনি। অবশ্য কিগানের নিজেকে পুড়িয়ে আত্মোতসর্গ করার দৃশ্য দর্শককে কিছুটা আবেগি করবে। গানগুলোতে শান্তি পেতে পারেন। টিমওয়ার্ক ভালো ছিল বলে ধরে নেওয়া যায়।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান



Previous Post Next Post