মুজিববর্ষ: ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে স্বাগতম

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি ও বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বর্ষ উদযাপনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মার্চ ১৭, ২০২০ থেকে মার্চ ১৭ ২০২১ সময়কালকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে যা এখন আমরা সকলেই জানি। এই মুজিববর্ষের উদ্বোধনী আয়োজনে অন্যতম রাজ অতিথি হয়ে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে আসছেন। এটি এখন নিশ্চিত। এবং এতে আমি খুশি। শুধু আমিই
নই, আমার মনে হয় বাংলাদেশের প্রত্যেকেরই খুশি হওয়া উচিৎ। সরকার ও দেশের কর্তাব্যাক্তিরা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে খুশি। তবে কিছুদিন পূর্বে নয়া দিল্লিতে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা এবং ওখানের নাগরিকত্ব আইন প্রসঙ্গকে সামনে এনে আমার দেশের অনেকেই চাইছেন না তিনি আসুক। মোটামুটিভাবে তাদের অবস্থান ও মতামত জানিয়ে দিয়েছেন অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। আবদ্ধ থাকেনি সোশ্যাল মিডিয়াতে, কিছু জায়গায় আমি দেখেছি পোস্টার ও ফেস্টুন নিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রের এই প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিবাদ করেছেন।

শুধু যে আমাদের সাধারণ মানুষের কাতার থেকেই ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে আগমন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সেটি নয়। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রধান প্রধান নেতা-কর্মীরাও সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
বসে থাকেনি আমাদের ইসলামি সমাজের কিছু শিল্পিও। পার্শ্ববর্তী এই বন্ধুদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের মানুষ যাতে প্রত্যাখ্যান করে তার দরখাস্ত করেছেন কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে, চিত্রে ও অন্যসব ব্যবস্থায় যেখানে জেশ্চারের মাধ্যমে বিশাল কিছু বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব হয় জনগনের কাছে।

প্রত্যেকের মতামতের প্রতিই আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি মানুষ আর মানুষ হিসেবে অন্য একজন মানুষের আবেগ বা সেন্টিমেন্ট কিছুটা হলেও বোঝার ক্ষমতা আমার সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়েছেন। আমি যা দেখছি, শুনছি বা একরকম পর্যবেক্ষণের দ্বারা বুঝতে পারলাম সেটি হলো- আমাদের এখানের বেশ কিছু মানুষ, বিশেষ করে মুসলমানদের একটি বড় অংশ ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিস্টার নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে আসাটা মানতে পারছেন না এর প্রধান কারণ হলো কিছুদিন আগে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্প সফর করছেন তখন দেশটির রাজধানী শহরে চলছিলো দাঙ্গা। যে দাঙ্গায় অর্ধশতেরও বেশি মানুষ নিহত হন, আহত হন আরও অগণিত মানুষ। বিশ্ব মিডিয়া বলছে, এটি একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যে দাঙ্গায় অংশ নিয়েছে উগ্রবাদী হিন্দুর দল, উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের কোণঠাসা করে রাখা এবং তাঁদের ধর্ম পালনে বাঁধা দেয়া। ইন্ডিয়ার বাঘা বাঘা সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, কিছু সংখ্যক উগ্রবাদী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মুসলমানদের ঘরে আগুন লাগিয়েছে, নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করেছে, মসজিদ ভাংচুর চালিয়েছে, ইত্যাদি। এর পাশাপাশি নাগরিকত্ব আইন নিয়ে মুসলমানদের সাথে এক বিশেষ রকম খেলা খেলেছে সেখানের সরকার, যে খেলা এখনও চলমান। এসমস্ত দিক বিবেচনায় বিশ্বের সমস্ত মুসলিম দেশের মানুষই ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর ক্ষিপ্ত। ক্ষিপ্ত হওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক? না, এটি আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে যেহেতু এই উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য মিস্টার মোদি খুব একটা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে আমরা খবর পাইনি।

আমাদের বাংলাদেশের যারা মুসলিম রয়েছি তাঁরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছি যার যার নিজস্ব স্টাইলে। শুধু মুসলিমরাই নন, আমাদের এখানের হিন্দু লোকেরাও নয়া দিল্লির ঘটনা এবং নাগরিকত্ব আইন, দুটো নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন; সেসবও নিজস্বসব স্টাইলে। ইন্ডিয়া বিশ্বের সব থেকে বড় গণতন্ত্রের দেশ, ধর্মনিরপেক্ষ দেশ; এসবই আমি জানি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি। ইন্ডিয়ার মতো দেশে খুব স্বাভাবিক ভাবেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকবে বা সেখানের কর্তৃপক্ষ এটিকে রক্ষার জন্য যা যা করার দরকার তা তা-ই করবেন, এই প্রত্যাশাই আমাদের সবার। কিন্তু বিশ্বমিডীয়ার খবরে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ইন্ডিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ব্যর্থ; অনেকেই একে ব্যর্থতা না বলে বরং বিজেপিকে উগ্রপন্থী বলে মনে করছেন। এর অর্থ হলো, ওখানে যা হচ্ছে সবই বিজেপি অর্থাৎ মিস্টার মোদির ইচ্ছে-অনিচ্ছের কারণেই হচ্ছে। যা আমাদের জাতির জনক তথা বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শবিরোধী বলে চিহ্নিত করতে পারি এবং বিশ্ব মানবতাবিরোধীও বলতে পারি। এই কারণেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বর্ষ উদযাপনে এদেশের অনেকেই মিস্টার মোদিকে চান না। এখানে আমার একান্ত নিজস্ব মতামত রাখা থেকে বিরত থাকলাম, যেহেতু এটি আমার বলার বিষয় না।

পরকথা হলো- ইন্ডিয়া একটি দেশ, আমাদের প্রতিবেশী দেশ। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ে ইন্ডিয়ার অবদান আমরা ভুলতে পারবো না বা অস্বীকার করতে পারবো না। এদিকে শেখ মুজিবুর রহমান হলেন আমাদের জাতির পিতা, আমরা আজকের যে বাংলাদেশ পেয়েছি সেটি তাঁর সাহসিকতার জন্যই। মুজিবের জন্ম না হলে হয়ত আমরা এ স্বাধীনতার কথা চিন্তাও করতে পারতাম না। আমরা যখন এই স্বাধীন বাংলাদেশের কথা চিন্তা করি তখন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর তর্জনি, ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহিদ, মা-বোনদের ইজ্জৎ, মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী ইত্যাদি কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কে এমনিতেই চলে আসে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিবাহিনী ছাড়া যেমন কল্পনাও করতে পারতাম না, তেমনি আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ও সম্ভবত ইন্ডিয়ার মিত্রবাহিনী ছাড়া আরো কষ্টকর হতে পারতো। আমি বিশ্বাস করি, এই মুহুর্তে যারা এই আর্টিকেলটি পড়ছেন তাঁরা আমার থেকেও বেশি জানেন বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে এবং একে বিশ্লেষণ ক্ষমতাও আমার থেকে বেশি। এখন আমার প্রশ্ন হলো, আপনি কিভাবে ইন্ডিয়াকে বাদ রাখতে পারেন আমাদের জাতির জনকের জন্মশত বার্ষিকি উদযাপনে? নিশ্চয়ই ইন্ডিয়াকে বাদ রাখা সম্ভব নয়। কথা হলো আপনি ইন্ডিয়াকে কিভাবে উদযাপনে শরিক করাবেন যখন আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করতে চলেছি মুজিববর্ষ?

আমরা যদি পুরো ইন্ডিয়াকেও আমন্ত্রণ করি এবং সেখানের প্রধানমন্ত্রীকে বাদ রাখি তাহলে কিন্তু এরকম একটি আয়োজন পূর্ণতা পেতে পারে না। বরং পুরো ইন্ডিয়াকে আমন্ত্রণ না করে শুধু একজন ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানালেই পুরো ইন্ডিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হয়ে যাবে, এ ব্যক্তি হলেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী। এই মুহুর্তে যেহেতু নরেন্দ্র মোদি ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী সেহেতু তাকেইতো আমন্ত্রণ জানাবে বাংলাদেশ সরকার, তিনিইতো আসবেন বাংলাদেশে। এখানে মিস্টার মোদির প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন ব্যক্তিপরিচয় বা তাঁর অন্যকোন পরিচয় কোনো গুরুত্ববহন করে না।

সুতরাং মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমরা বিজেপির নরেন্দ্র মোদিকে দেখছিনা, দেখছি ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী মোদিকে। স্বাগত জানাচ্ছি বন্ধুদেশ ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে।



মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info

(এই লেখাটি মার্চ ৮, ২০২০ আমি আমার ফেসবুক টাইমলাইনে শেয়ার করি)
Previous Post Next Post