মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা


অন্তত আমাদের দেশে দেখা যায় যে, বেশিরভাগ উচ্চ শিক্ষিত চাকরি প্রত্যাশী কখনোই পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে পছন্দের তালিকায় রাখেন না। পছন্দের তালিকায় শিক্ষকতা না থাকলেও  অনেকেই শেষ পর্যন্ত এই পেশায় আসতে বাধ্য হন জীবিকার তাগিদে, কেননা অন্যসব ক্ষেত্রে এঁরা অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে অথবা এঁদের মেধাকে যথাযথ ভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি কোন নিয়োগ কর্তা। পাশাপাশি আরো একটি সমস্যা আছে, সেটি হলো দেশে বেকারদের তালিকাটি খুবই লম্বা। 
বেকারদের বেশিরভাগ এই শিক্ষকতায় (বিশেষ করে বেসরকারি স্কুল/কলেজে) এসেছে কারণ অন্যসব পেশার থেকে এই পেশায় আসা খুবই সহজ। ২০০৫ সালের আগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) গঠন করার পূর্বে স্নাতক/স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করা যে কাউকে ধরে নিয়ে এখানে চাকুরি দেয়া যেত বা স্কুল/কলেজ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতো এবং একটি নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করত। কিন্তু দেখা যেত এই নিয়োগ পরীক্ষা ছিল শুধু লোক দেখানোর জন্যই। যাকে নেয়া হবে তাঁর সাথে আগে থেকেই সব ঠিক হয়ে থাকতো, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দিয়ে দেয়া হতো। কোন প্রার্থী প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পরে সুবিধা না করতে পারলেও তাকে যেভাবেই হোক ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে নিত অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে, যদিও কিছু প্রতিষ্ঠান ঠিক যোগ্যদেরই নিয়োগ দিতো। 
এরপরে যখন এনটিআরসিএ গঠন করা হলেও তখনও দীর্ঘ্য সময় ধরে এই রীতিই চলতে ছিল। পার্থক্য ছিল শুধু একটি দিকে- আগের মতো স্নাতক/স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করা যে কেউকে এনে নিয়োগ দেয়া যাবেনা, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। নিবন্ধন পরীক্ষায় তাঁদেরই সনদ দেয়া হয় যারা ১০০ নম্বরের বহুনির্বাচনী প্রশ্ন আর বিষয় ভিত্তিক লিখিত পরীক্ষায় নির্দিষ্ট নম্বর পায় তাঁদের। আর এই নিবন্ধনধারীরাই কেবল বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদন করতে পারবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাজ যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজেদের কাছে ছিল সেহেতু অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে অযোগ্যদের নিয়োগের বিষয়টি ছিলই। কিন্তু নিয়োগদানের জন্য এখন কেন্দ্রিয় ভাবে মনোনয়ন করা হয় মেধাতালিকা ও পছন্দক্রম পদ্ধতির মাধ্যমে যে কাজটি স্বয়ং এনটিআরসিএ করে থাকে। 
এনটিআরসিএ’র সর্বশেষ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দ্বারা স্কুল-কলেজের নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ হয়েছে কিন্তু এই কর্তৃপক্ষ কি বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে যে, তাঁরা মানসম্পন্ন শিক্ষক সরবরাহ করতে পারছে? আমার বিশ্বাস তাঁরা এখন পর্যন্ত যা করেছে তাতে বুক ফুলিয়ে দেশদরবারে কেন এই কর্তৃপক্ষের সদস্যরাই নিজেদের কানাকনি করে বলতে পারবেনা, ‘খুব ভাল কাজ করেছে এ পর্যন্ত’। 
আমার বেশ কিছু পরিচিতজন বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করছেন এনটিআরসিএ’র নিবন্ধন সনদ দিয়ে এবং এঁদের মাসিক বেতনভুক্তও করা হয়েছে কিন্তু লজ্জা লাগে বলতে যে, শ্রেণিকক্ষে কিভাবে পড়াতে হয় সেটি তাঁরা এখনও সঠিক ভাবে জানেন না। আমার লেখাটি যারা এই মুহুর্তে পড়ছেন তাঁরা নিশ্চয়ই একটি বিষয়ে অবগত আছেন, যে বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রচলিত সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি নিয়ে অনেকেই বলছেন এটি খুব ভাল পদ্ধতি না বরং শিক্ষার্থীদের চাপে ফেলছে। কিন্তু যারা একটু সচেতন তাঁরা এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করেই থাকেন এবং বলেন- সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি খুবই ভাল এবং যুগোপযোগী পদ্ধতি কিন্তু রাষ্ট্র মানসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি করতে পারছে না। 
আমি বরাবরই বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি, গল্প করি। কয়েকদিন আগে ঢাকার অদূরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলি। আমি ওদের সাথে যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলি তাঁর মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল, ‘তোমাদেরকে সৃজনশীল প্রশ্ন কিভাবে পড়ানো হয়?’ উত্তর আসে, ‘সৃজনশীল প্রশ্ন আবার কিভাবে পড়াবে? এটিতো আমাদের স্যাররাও (শিক্ষক) জানেন না যে, কোন কোন জায়গা (টপিক) থেকে প্রশ্ন  করা হবে। কিন্তু শিক্ষকরা আমাদেরকে গাইড বই থেকে কিছু  প্রশ্ন ঠিক করে দেন ওগুলোই পড়ি’। শিক্ষার্থীরা আমাকে জানায়, ওদের মূল বই অর্থাৎ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক কর্তৃক প্রণীত বই ওরা খুব একটা পড়েনা, পড়তেও হয় না; কিছু শিক্ষকও এমনটা বলেন যে, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ না। সৃজনশীল ও বহুনির্বাচনি প্রশ্নের জন্য জন্য গাইড অনুসরণ করলেই হয়– এর মানে কী দাঁড়ালো? এখানেও কি শিক্ষকদের অদক্ষতার বিষয়টি ফুটে ওঠেনি? 
আমরা বাংলাদেশিরা ভাল শিক্ষক বলতে বুঝি- যারা ইংরেজি গ্রামার একটু ভাল বোঝাতে পারেন বা গণিতে বেছে বেছে কিছু অংক করান যা প্রায় সময়েই পরীক্ষার প্রশ্নে থাকে। বেশ হাস্যকর একটি মাপকাঠি। আপনারা কোন শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন, বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গ্রামার পড়ানো হয় কিন্তু দু’চারজন বাদে যা পড়ানো হলো তার ৫০ শতাংশও কোন শিক্ষার্থী শিখতে পারে না বা শিক্ষক শেখাতে পারেন না। ইংরেজি, গণিত এবং নবম-দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞানের দু’একটি বিষয় বাদে  অন্যসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কেবল রুটিনে আছে বলেই শিক্ষকরা ক্লাসে যান। আর যেসব বিষয়গুলো খুব ভাল করে পড়ানো হয় সেসবও যে খুব ভাল করে পড়ানো হয় সেটিও নয়। আমাদের মাধ্যমিক পর্যায়ের ইংরেজি শিক্ষকরা ভাবতেই পারেন না যে, শুধু গ্রামার পড়ানোর বাইরেও শিক্ষাক্রম ও সিলেবাস অনুসরণ অনেক কিছু পড়ানোর আছে। যেমন প্যারাগ্রাফ বা কম্পোজিশনের কথাই ধরা যাক, এসবকে আমরা কেবল মুখস্ত নির্ভর বলেই জানি; অবশ্য এমন করেই আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি কর্তৃক। কিন্তু এগুলোও যে সঠিক ভাবে পাঠাদানের দ্বারা মুখস্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনা যায় এবং শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মেধা ও মননের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা যায় সেটি আমরা জানিনা। আমাদের দেশে স্কুল-কলেজে পাঠ শেখানো হয়না, পাঠ মুখস্ত করণে চাপ প্রয়োগ করা হয়; শিক্ষকদের জানতে হবে এটি ‘প্লেজিয়ারিজম’র আওতায় পড়ে। 
আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষক সমস্যা নিয়ে কথা বলে শেষ করা যাবেনা। তবে আমরা যখনই কোন সমস্যা নিয়ে কথা বলি তখনই চিন্তাবিদরা বলে ওঠেন বাংলাদেশ অনেক ছোটদেশ এবং আর্থিক ভাবে এদেশ খুব স্বচ্ছল নয় যে কারণে আমাদের ইচ্ছে হলেও অনেক কিছু করা যায়না। আমাদের একটি ধারণা জন্মেই গেছে আমাদের আর্থিক সমর্থ্যের দৌড় খুব বেশি না সে শিক্ষা ক্ষেত্রের উন্নতির জন্য হোক কিংবা সামরিক ক্ষেত্রে।  এই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে আর কতদিন চলবে? আমরা এখন আর পূর্বের অবস্থানে নেই। দেশ এগিয়েছে, দেশের নীতিনির্ধারকদেরও ধারণাও বদলেছে যা অনেকটাই যুগের সাথে খাপ খাচ্ছে। 
বিগত কয়েক বছরে এনটিআরসিএ বেশ সমালোচনার মুখেই আছে কিন্তু তাঁরা এমন কোন পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত নিতে পারেনি যা একটু হলো মানুষ তাঁদের পক্ষে কথা বলবে। শুধু বহু নির্বাচনী প্রশ্ন আর একটি লিখিত পরীক্ষা নিলেই কি একজন মান সম্পন্ন শিক্ষক খুঁজে পাওয়া যায়? অনেকেইতো অনেক কিছু জানেন কিন্তু নিজের জানা থেকে সঠিক ভাবে অন্যকে জানানোর মতো সক্ষমতা আছে ক’জনের? 
দৈনিক ইত্তেফাক’এ জুলাই ৬, ২০১৭ তারিখে ‘সবাই কি শিক্ষক?’ শিরোনামে আমার একটি ছোট্ট নিবন্ধ প্রকাশিত হয় যেখানে আমি শিক্ষক হান্টিংয়ের কথা বলেছিলাম। কিন্তু আমি জানিনা এটি কতটা বাস্তব সম্মত, তবে করা গেলে ভাল হবে। এনটিআরসিএ’র এই সনদ প্রদান এবং নিয়োগে মনোনয়ন দানের মাধ্যমে বেকারত্ব কমানোর দায়িত্ব হাতে না নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক খুঁজে বের করুক, এটিই আমাদের প্রত্যাশা। আরেকটি বিষয় না ভাবলেই নয়, দেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজসমূহে শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ে চার বছর মেয়াদী স্নাতক চালু করা আছে মাধ্যমিক স্তরের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক তৈরির জন্য কিন্তু কতটা সফল এই সিদ্ধান্ত? প্রত্যেক বছরেই অনেক ছেলেমেয়ে এসব কলেজ থেকে বের হয় যাদেরকে খুবই দক্ষ করে গড়ে তোলেন এসব কলেজের শিক্ষক-প্রশিক্ষকরা এবং আটটি সেমিস্টারের একটি সেমিস্টারেতো প্রতিষ্ঠিত কোন স্কুলে শিক্ষকতা করতে হয় ইন্টার্ন হিসেবে, এঁদের নিয়েও এই কর্তৃপক্ষ কিছুটা ভাবতে পারে। 
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ কতটা মানসম্পন্ন শিক্ষক দিতে পারছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেটি কখনো কেউ ভেবে দেখেছেন? অথচ এখন শিক্ষক নিয়োগের জন্য মনোনয়নের কাজটিও তাঁদের হাতে চলে যাওয়ায় নিজেদের পছন্দ মতো কোন ভাল মানের কেউকে নিয়োগ দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান



(এই প্রবন্ধটির প্রধান অংশ মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র ভূমিকা শিরোনামে দৈনিক বাংলাদেশের খবর পত্রিকায় মে ৩, ২০১৯ তারিখ প্রকাশিত হয়)
Previous Post Next Post