প্রয়োজনে নিজেকে বদলাতে হবে

কিছুদিন আগে আমার এক শিক্ষক, জয়দীপ দে স্যার, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছিলেন। তিনি যা বলেছিলেন তা অনেকটা এরকম, আমরা যেন সিনিয়রদের সাথে কুশল বিনিময়ের সময় নিজ থেকে হাত বাড়িয়ে না দেই করমর্দন করার জন্য। এটি নাকি বিশ্বজুড়ে বেশিরভাগ মানুষই অপছন্দ করেন। ভাল লেগেছিল। আমি জানি এটি অনেকেই মেনে চলেন। কিন্তু যাদের সাথে সম্পর্কের গভীরতা গভীরতা রয়েছে তাদের বেলায় এটি মানা হয় না অনেক সময়। তবে সম্পর্কের গভীরতা যতটাই থাকুক কিছু সময় কিছু ক্ষেত্রে আমাদের একটু দেখেশুনে চলতে হয়। ভদ্রলোকেরা একে বলেন 'ফরমালিটি'।


আপন, চাচাত-মামাতো-খালাতো, পাড়া ও ক্যাম্পাসের কিংবা পরিচিত নিজের থেকে বেশি বয়সীদেরকে এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভাই বা ভাইয়া বলে সম্বোধন করে, এটি ছেলেদের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে সবার একটি বিষয় মেনে চলতে হয়। উদাহরণ দিয়েই বলার চেষ্টা করলাম। বলো ‘মিজান ভাই’; 'মিজান ভাইয়া' নয়। আর যদি ‘ভাইয়া’ বলতেই হয় তবে বড়দের নাম উচ্চারণ করোনা, ভাল শোনায় না। এখানে আমি আমার নাম দিয়ে বলার চেষ্টা করলেও এটি সবার জন্যই প্রযোজ্য। যখন তোমরা তোমাদের বড়দের সাথে কথা বলো তখন এমন কিছু করোনা যাতে করে খুব অল্পতেই তোমার প্রতি তাদের মনে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দেয়। প্রথম সাক্ষাতে তোমাকে একটু বেশি খেয়াল রাখতে হবে এদিকে। তবে মাত্রাতিরিক্ত নয়, মাত্রা পেরিয়ে গেলে সব কিছুই খারাপ হয়। 
 আমার প্রিয় শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম একজন রঞ্জিত পোদ্দার স্যার, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে এসে পেয়েছি। একদিন ক্লাসে তিনি বলেছিলেন, “আমি কখনোই আমার ছেলেমেয়ের ক্লাস রোল নিয়ে ভাবিনা, পরীক্ষার খাতায় কত পেল সেটাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়; আমি শুধু পর্যবেক্ষণ করি- তারা কি শিখছে, কতটুকু শিখলো, আরেকটু ভাল না শিখতে পারার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে”। আসলেই একটা ক্লাসের সবাইতো আর প্রথম স্থান অধিকার করতে পারবে ন। কোন ক্লাসে ৭০ জন শিক্ষার্থী থাকলে সেখানে ৭০ টি পজিশন থাকবে। তবে প্রথম স্থান অর্জন করার সুযোগ সবার জন্যই আছে, চেষ্টা করা উচিত। প্রতিযোগিতা হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাও সবার আছে। হেরে যাওয়া মানে ব্যর্থ হওয়া নয়। পাশাপাশি অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। 
আমরা সকলেই এক প্রকৃতির অভিভাবক চিনি যারা নিজেদের ছেলেমেয়ের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ভাবেন। এটি তারিফযোগ্য একটি বিষয়। তবে সন্তানের বয়স দুই বছর হতে না হতেই তাঁদের কপালে ভাঁজ পরে যায়, কোন স্কুলে ভর্তি করাবেন তাই নিয়ে। তিন-সাড়ে তিন হতে না হতেই শহরের নামিদামি প্রি-স্কুল, কিন্ডারগার্টেন বা ইংলিশ মিডিয়াম সাইনবোর্ড লাগানো প্রতারকতুল্য স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। ভর্তির পর থেকেই টাকার খেলা সেখানে। ওইসব স্কুলের কর্তৃপক্ষ হলো এমন, শিক্ষার্থী সম্পর্কে যতটা সম্ভব ইতিবাচক মন্তব্য করে অভিভাবকদের মন ভুলিয়ে রাখে। নতুন অভিভাবকরাও এনিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, স্কুলের বিভিন্ন প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকে, তাদেরকেও বিভিন্ন ভাবে পুরস্কৃত করে খুশি রাখেন যার দরকার নেই। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় এইসব অভিভাবক যতটা ওইসব স্কুলের আভিজাত্য নিয়ে ভাবেন ততটাই উদাসীন হয়ে পরেন সন্তানের ভবিষ্যৎ আভিজাত্য নিয়ে; তাঁরা শান্তি অনুভব করেন এই ভেবে, আর যাই হোক স্কুলটা ভাল। ঠিক এমন ভাল স্কুলের খপ্পরে পরে অনেক বাবা-মা'ই হেরেছেন। কারণ, এঁরা বিদ্যালয়ের পেছনে টাকা খরচ করতে প্রস্তত, ভাল কোচিংয়ের পেছনে টাকা ভাংতে প্রস্তত, ভাল নোট গাইডও কিনে দেন কিন্তু সন্তান কি করছে, কি শিখছে, কোথায় যাচ্ছে, কি চাচ্ছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতে রাজী নন। এদিকে আমাদের কিঞ্চিত খেয়াল রাখা জরুরী। 

২০১৮ এর নিম্ন মাধ্যমিকের পরীক্ষায় চতুর্থ বিষয় না থাকার কারণে অনেক ছেলেমেয়েই এপ্লাস পায়নি যা নিয়ে সন্তুষ্ট নন অনেক অভিভাবক। কিন্তু এঁরা এটা ভাবেনা যে, এতে করে মেধাবীদের একটু হলেও সহজে খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। এখানে পরিমাপের চেয়ে মূল্যায়নই মূখ্য। 
আমরা একটি বিশেষ বিষয় দেখে অভ্যস্ত। বিনোদন, খেলার মাঠ বা রাজনীতির বিভিন্ন তারকার কীর্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকে অনেকে। তারা কী করলো, কেন করলো, উচিৎ নাকি অনুচিত ছিল সে কৃত কর্ম ইত্যাদি নিয়ে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। আমাদের প্রত্যেকেরই এগুলো এরিয়ে চলা যুক্তিযুক্ত যদি সেখানে আমাদের হাত দেয়ার ক্ষমতা না থাকে। সবার আগে নিজেকে নিয়ে ভাবা উচিত, তারপর আমি যাদের ওপর নির্ভর করছি বা আমার ওপর যারা নির্ভরশীল। শেষের দিকে সুযোগ থাকলে এবং প্রয়োজনে অন্যসব নিয়ে ভাবা চলে। 
ধরো, একটা চোর আছে তোমার এলাকায়। কিছু মাত্রায় জনসেবাও করে সে। রাতের আঁধারে চুরি করে আর দিনের আলোতে গ্রামসেবায় বের হয় বা নিজের সাধুতার জানান দেয়ার জন্য নিজেই নিজের ঢাক পিটিয়ে বেড়ায়। তুমি তাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? বিশ্বাস করি, তুমি ওই চোরের ধারেকাছেও যাবে না বা সুযোগ বুঝে উচিত শিক্ষা দিতে প্রস্তুত। এখন তুমি ওই জনসেবী চোর হবে কিনা বা এ সমস্ত চরিত্রের লোকেদের প্রশ্রয় দিবে কিনা সেটা নিজেই নিজের বুদ্ধি বিবেচনা খরচ করে ভাবো। 
শেষের দিকে একটি কথা বলা খুবই জরুরী, 'আমার পরিবারের কাছ থেকে আমি যে শিক্ষাটি পেলাম সেটি সব সময়ই আমার কাছে পূজনীয়। কিন্তু আমি যা শিখলাম তা অনেক সময় অনেকের কাছেই আপত্তিকর বলে মনে হতে পারে। ঠিক এ কারণেই আমাকে অনেক সময় আচার-ব্যবহারের পোষাক পরিবর্তন করতে হয়, পুরোনোটাও রেখে দেই। ওটা কাজে লাগে। কাজে লাগে নিজের মতো করে চলতে'। 

বাঁচো নিজের মতো করে, প্রয়োজনে নিজেকে বদলানো জরুরী, প্রয়োজন শেষে স্বরুপে ফেরো যদি তা ইতিবাচক বিবেচিত হয়।


মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info
#mizanurrmizan


(প্রবন্ধটির প্রধান অংশ জানুয়ারি ২০, ২০১৯ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত)
Previous Post Next Post