ইংরেজিতে লিসেনিং ও স্পিকিং ব্যবহারিক

দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি স্কুল ও কলেজে ইংরেজি বিষয়ের পাঠদানকার্য ইংরেজিতেই পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। বিষয়টা সত্যিই সুখকর অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। মাউশির এই খবরটিতে এতটাই রোমাঞ্চিত যেশিক্ষাজীবন শুরু থেকে শুরু করতে মনে চায়। ইংরেজিতে শিক্ষক কথা বলবেনপ্রশ্ন করবেনআমরা শিক্ষকের সাথে ইংরজিতে কথা বলবউত্তর দেবনা পারা বা না বোঝা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করবখুব মধুর হবে।

আমাদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল বিদ্যালয় থেকে দেওয়া তিনটি ছেড়া বই দিয়ে। সেই পুরনো ছেড়া বইগুলোই যে উল্টাতে কত ভাল লাগত সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়খুব উচ্ছাস কাজ করত মনে। আমাদের নতুন বই আসতে আসতে দুই-আড়াই মাস লাগতআবার কখনো কেউ কেউ নতুন বই পেতনাকেউ আবার অর্ধেক পুরাণ আর অর্ধেক নতুন বই দিয়েই বছর পার করত। অবশ্য আমাদের বর্তমান সরকার খুব ভালভাবেই এ সমস্যার সমাধান দিয়েছেনপ্রত্যেক শিক্ষার্থীই বছরের শুরুর দিকেই নতুন বইয়ের সান্নিধ্য উপভোগ করতে পারছে। এইসব বই ধীরে ধীরে কিভাবে আরো সময়োপযোগী ও আকর্ষনীয় করা যায় সে দিকটি নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কাজ করে যাচ্ছে সফল ভাবেযদিও বিভিন্ন সময়ে অপ্রত্যাশিত কিছু বিষয়ের জন্য সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে এনসিটিবি সব সময়ই এসব সমালোচনাকে ইতিবাচক ভাবে দেখেছে এবং দায় সমুহ মাথা পেতে নিয়েছে। আসলে এটা খুবই স্বাভাবিক যেহঠাৎ করে বিশালাকার পরিবর্তন করতে গেলে সামান্য কিছু ত্রুটি হতেই পারে।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আমার বাংলা বইপ্রাথমিক গণিত এবং English for Today নামের তিনটি বই দেওয়া হয় এবং এ নিয়ে একাডেমিক কাজ চলে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে যোগ হয় আরো তিনটি। এরপর ষষ্ঠ থেকে ক্রমে ক্রমে বইয়ের সংখ্যা আরো বাড়তে থাকে। প্রত্যেকটি বই সাজানো হয়েছে বিভিন্ন ভাবে যা আধুনিক শিক্ষা সহায়কতবে পাঠদান সমস্যা সমাধানে চোখে পড়ার মত পরিস্থিতি পুরোদেশে এখনও হয়নিকয়েকটি স্কুল-কলেজ ছাড়া। অন্যসব বিষয়ের পাঠদান নিয়ে কোন রকম কথা না উঠলেও ইংরেজি বিষয়ের পাঠদান নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন উঠেছে। এটি একটি বিদেশি ভাষাবিদেশি ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শিক্ষকরা বিভিন্ন রকম পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। আর সে ভাষাটি যখন ইংরেজি তখন তা আরো কতটা গ্রহনযোগ্য পদ্ধিতিতে হওয়া উচিৎ সেটা সেটা নিয়েই বেশি ভাবতে হয় একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িতদের।

আমাদের দেশের শিক্ষকরা যে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে পদ্ধতিটি ব্যবহার করে থাকেন সেটিকে আমরা ব্যকরণ-অনুবাদ পদ্ধতি (Grammar-Translation method) বলতে পারিসংক্ষেপে বলা হয় GTM। এ পদ্ধতিতে ব্যকরণের বিভিন্ন নিয়মকানুনের ওপর অধিক গুরুত্বারপ করা হয় এবং টার্গেট ভাষাটি মাতৃভাষায় অনুবাদ করা হয় যে কারণে শিক্ষার্থীদের টার্গেট ভাষায় চিন্তন ক্ষমতা ভাল ভাবে তৈরি হয়না এবং শিক্ষার্থীদের না বুঝে মুখস্ত করার প্রবণতা বেড়ে যায়দেখা যায় ছেলেমেয়েরা মুখস্ত করার বিকল্প কিছুই ভাবতে পারেনা। আমাদের দেশের যেসব সহায়ক বই বাজারে পাওয়া যায় সেসবও এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই। ব্যকরণ অনুবাদ পদ্ধতি এমন একটি পদ্ধতি যেটি মাতৃভাষা আরও ভাল করে শিখতে সাহায্য করেশিক্ষকদের জন্যও সহজ পদ্ধতি বটে এবং স্বল্পপ্রস্ততি নিয়েই ক্লাসে যেতে পারেন। অনুবাদের সাহায্য নিয়ে শিক্ষার্থীরা যেকোন কিছু সহজেই বুঝতে পারে বটে তাতে টার্গেট ভাষা শিক্ষায় বড় ধরণের বিরূপ প্রভাব ফেলে থাকে। এ পদ্ধতিটি এনসিটিবি সমর্থিত নয়।

পদ্ধতিটি যে শুধু বাংলাদেশের শিক্ষকরাই ব্যবহার করে থাকেন তা কিন্তু নয়ধরা হয় এর শুরু হয়েছিল চতুর্দশ শতাব্দিতে লাতিন ভাষা চর্চার জন্য। তখন লাতিন ভাষাটি খুব প্রভাবশালী ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে তা ইংরেজিফরাসিইতালিয়ান ভাষা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় আর লাতিনও বিদায় নেয়। লাতিন বিদায় নিলেও ব্যকরণ-অনুবাদ পদ্ধতি বিদায় নেয়নি বরং অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতাব্দিতে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিদেশি ভাষা শেখার জন্য সহজ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হত। ভাষা শিক্ষায় একে সনাতন বা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি বলা হয়ে থাকেসহজ হলেও ঐতিহ্যগতভাবেই বিদেশি ভাষা শিখতে অপেক্ষাকৃতভাবে কম উপযোগী একটি পদ্ধতি।

কালের বিবর্তনে বিভিন্ন রকম পদ্ধতির (Method/Approach) প্রচলন ঘটেছেযেমন- প্রত্যক্ষ পদ্ধতি (The Direct Method), সাংগঠনিক পদ্ধতি (The Structural Approach), যোগাযোগমূলক পদ্ধতি (Communicative Approach) ইত্যাদি। ভাষা শিক্ষার উদ্দেশ্য হল- ভাষা বুঝতে পারা এবং যোগাযোগ করার সামর্থ্য অর্জন। আর যেকোন ভাষা ভালভাবে আয়ত্ব করতে হলে একজনকে চারটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হয়- শোনা (Listening), বলা (Speaking), পড়া (Reading) এবং লেখা (Writing)। এই চারটি দক্ষতাই মূলত মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তাই বিগত শতাব্দী থেকেই যোগাযোগমূলক পদ্ধতি বা Communicative Approach জনপ্রিয়তা পেতে থাকেযেহেতু পদ্ধতিটি এই চার দক্ষতা অর্জনের উদ্দেশ্যেই উদ্ভব হয়েছে। এই ভেবেই বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক বোর্ডও যোগাযোগমূলক পদ্ধতিতে ভাষা শিক্ষা দেওয়ার পক্ষে সমর্থন করেছে অনেকদিন গত হয়েছেপাঠ্যপুস্তকও সেভাবেই করা হয়কাঙ্ক্ষিত ফল আর অর্জন হয়নি। এ দায় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নয়দক্ষ ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবেই এমন হচ্ছে। ভাষা শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনে ক্রম শোনাবলাপড়া এবং লেখা হলেও আমরা একে কিছুটা উল্টো করে ভাবি অর্থাৎ পড়ালেখাশোনা এবং বলা। এটি মূলত যোগাযোগমূলক পদ্ধতির ত্রুটিমূলক প্রয়োগ। গত শতকের শেষাংশ থেকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এ পদ্ধতিটির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট হল- কথা বলতে বিশেষভাবে গুরাত্বারোপ করে কিন্তু আমাদের দেশের পরীক্ষা পদ্ধতি শুধুমাত্র লিখিত হওয়ার কারণে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা শোনা এবং বলার চর্চা বাদ রেখে সনাতন পদ্ধতি (GTM)-এর কৌশল অবলম্বন করে থাকেন। পদ্ধতিটির সঠিক প্রয়োগে বাঁধার সৃষ্টিকারী ওপর একটি প্রধান কারণ দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং পরীক্ষায় শোনা’ ও বলা’ অন্তর্ভুক্ত না থাকা।

এবার যেহেতু মাউশি ইংরেজি ক্লাস পরিচালনায় ইংরেজি ভাষার ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে সেহেতু একে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই বলতে পারি। আমরা জানি যেদেশের বেশিরভাগ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকরা ইংরেজিতে কথা বলতে খুব দক্ষ নন যা নির্দেশনাটির বাস্তবায়নে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। সুতরাং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং পর্যায়ক্রমে শিক্ষকদের ইংরেজিতে কথা বলায় দক্ষ করতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহন করার বিকল্প নেই। পাশাপাশি ইংরেজি বিষয়ের ওপর ব্যবহারিক হিসেবে পরীক্ষায় লিসেনিং (Listening) এবং স্পিকিং (Speaking) অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা সে বিষয়ে ভেবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান

Previous Post Next Post