নিরাপদ সড়ক চাই: শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ কেন?

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক শিক্ষার্থীর রক্তমাখা জুতো
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক শিক্ষার্থীর রক্তমাখা জুতো    

পুলিশের গাড়িতে উঠে নাগিন ড্যান্স দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, ছবিটি তোলা হয়েছিল বরিশাল থেকে। ঢাকায় প্রধান্মন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি গাড়ি আটকে দিয়ে তার গ্লাসে লিখে দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, "লাইসেন্স কই?" এমন আরো কিছু দেখেছি।

কুর্মিটোলায় দুই শিক্ষার্থী বাস চাপায় নিহত হওয়ার পর থেকেই রাস্তায় নেমেছে শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবী বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসুচি দেশের সবার নজর কেড়েছে বিশেষ ভাবে। নিরাপদ সড়কের দাবী দেশের প্রত্যেকটি সাধারণ জনগণের কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাঁদের আন্দোলনকে যেভাবে রূপ দিয়েছে বা পরিচালনা করেছে সেটি সত্যিই হৃদয় ছুয়ে গেছে সবার। স্লোগানের পাশাপাশি গাড়ি আটকে ড্রাইভারের লাইসেন্স আর বৈধ কাগজপত্র দেখতে চেয়েছে শিক্ষার্থীরা। যারা না দেখাতে পেরেছে তাঁদের থেকে চাবি নিয়ে গাড়ি ঠেলে সড়কের পাশে দাড় করিয়ে রেখেছে। সাধারণ মানুষ, পেশাদার চালক, এম.পি.-মন্ত্রী তথা রাজনীতিবিদ, পুলিশ-প্রশাসন কেউই বাদ যায়নি পড়েনি এই ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে। যাকেই পেয়েছে লাইসেন্স বা বৈধ কাগজপত্র বিহীন তাকেই দিয়েছে উচিৎ শিক্ষা। আসাদগেটে একজনকে লাইসেন্স না থাকার অপরাধে সাদা কাগজে লিখতে বাধ্য করেছে ‘আমার লাইসেন্স নেই’। সায়েন্স ল্যাবে একজন পুলিশ সদস্যকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। যতটুকু বুঝতে পেরেছি, যাকে যাকে সড়কে ওরা ধরেছে তারা কেউই লাইসেন্স ব্যতিত চালকের আসনে বসার সাহস পাবেন না। তবে ভুক্তভোগী ওইসব চালকরা নাজেহাল হলেও পুরো জাতি পুলকিত, বহুদিন পর গর্ব করার মত কিছু পেয়ে আমরা সত্যিই নিজেদের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
বাংলাদেশের মানুষ খুব সম্ভবত কখনও কোন ড্রাইভারকে লেন মেন্টেইন করতে দেখেনি কিন্তু শিশু কিশোরদের তোপের মুখে তারা তা করতে বাধ্য হয়েছে। অবাক করা বিষয় হল এদের বেশিরভাগ ছেলে মেয়েই হল ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সী। আর যারা একটু বড় কিংবা উচ্চতর শ্রেণিতে পড়ে তাঁদের সংখ্যা কম। কম হলেও ছোটদের তারা ঠিক পথে আন্দোলন চালাতে উৎসাহ ও সাহস প্রদান করেছে। আমার মনে হয় না দেশে এমন কোন মানুষ আছে যার মন ওদের এই কয়েকদিনের কর্মকাণ্ডে খুশিতে নেচে উঠেনি, ওদের মধ্যে দেশের প্রকৃত ভবিষ্যৎ খুঁজে নিয়েছেন কেউ। কেউ আবার আবেগে দু’ফোটা অশ্রুজল ঝড়িয়েছেন।
আমরা দেখি দেশে যেকোন আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনটি পক্ষ থাকে। এক পক্ষ থাকে পক্ষে, আরেক পক্ষ থাকে বিপক্ষে আর তিন নম্বরের পক্ষটি নিরপেক্ষ, কিন্তু ‘আমরা নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে যেন আমি একটি পক্ষই দেখতে পেলাম। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের সঙ্গে গোলাপ এবং লজেন্স আদান প্রদান জাতিকে এক অন্যরকম ভাল লাগার অনুভূতি দিয়েছে যা ঘুমের ঘোরেও ঠোটের কোনে হাঁসির খোঁড়াক হতে পারে। আমি দেখেছি পুলিশ শিক্ষার্থীদেরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে এসে উল্টো গান শুনিয়ে গেছে। বাহ! ছেলেদের কি মন্ত্র।
একটি প্লাকার্ডের ওপর লেখা ছিল ‘পুলিশ আংকেল আপনাকে চা-নাস্তার খরচ আমি দেব, তবুও এভাবে গাড়ি চলতে দিয়েন না’, যেটি একটি ছোট্ট পিচ্চির হাতে ধরা ছিল। একটি বিবেককে জাগিয়ে তুলতে এর চেয়ে আর কি ধরণের আঘাত করতে হয় সেটা জানা নেই। আরেকটি প্লাকার্ডে দেখেছি, ‘জনপ্রতিনিধিদের সপ্তাহে তিনদিন গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হবে’।
যাদের কর্মের বিপক্ষে এই আন্দোলন তাঁদের নিয়ে কিছু বলতে হয়। প্রথমত এরা সবাই সাধারণ মানুষ, পরে শ্রমিক, এরও পরে বেপরোয়া বা লাইসেন্স বিহীন চালক বা শ্রমিক। শুধু মানুষ হিসেবে তাঁদের ধরা হলে তারা যা করছে তা ক্ষমা করে দেওয়া যায় অল্প হলেও। আমরা তাঁদের কর্ম ভুলজ্ঞান করে পার করে দিতে পারি। কিন্তু একেকজন যখন শ্রমিক তখন তাঁদের কিছু দায়বদ্ধতা থাকে। একেকজন শ্রমিক যখন তাঁদের শ্রমের দ্বারা অন্যের সেবায় নিয়োজিত থাকেন তখন তাঁদের নিকট অন্যের জান-মাল আমানত হিসেবে থাকে। যার খিয়ানত কোন মতেই করা উচিৎ নয়। এইসব শ্রমিক যখন কোন যানবাহনে চালকের আসনে থাকেন তখন স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীদের জীবন তাঁদের কাছে আমানত হিসেবে থাকে, শুধু যাত্রী নয় পথচারীদের জীবনও। বিশ্বাস করি তারাও এ সম্পর্কে অবগত। প্রশ্ন হচ্ছে কেন তবে এমন সব দুর্ঘটনা ঘটছে? আবার এমন না যা, চালক বা তার সহকারী জীবন হারান না বা জীবন হারানোর ভয় থাকেনা।
আমরা দেখে থাকি গণপরিবহনের একেকজন চালক বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালিয়ে চালিয়ে থাকেন। বেপরোয়া গাড়ি টানা কারো কারো স্বভাব হলেও কেউ কেউ টানেন বাধ্য হয়ে। আমরা যদি ঢাকা শহরের দিকে তাকাই, দেখব একেক রুটে পাঁচটি থেকে পনেরটি বাস রয়েছে, রাস্তায় জ্যাম থাকে। একারনে তারা অনেক সময় সামনে থাকা একই রুটের গাড়িকে পেছনে ফেলার জন্য বেপরোয়া হয়ে থাকে, কিন্তু এটাতো সামনে থাকা গাড়ির চালক চাইবেনা যে পেছনে থাকা গাড়িটি তাকে ওভারটেক করুক। কেননা তাঁদের প্রত্যেকেরই লক্ষ্য হল যত বেশি যাত্রী তোলা যায় যাতে করে আকই রুটের অনেকগুলো গাড়ি এবং জ্যামকে পাশ কাটিয়ে দিনের নির্ধারিত আয় পকেটে নিয়ে ঘরে যেতে পারেন। এমন করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। কিন্তু আমরা শহরের বাইরে হাইওয়েগুলোর দিকে তাকালে চালকদের ঔদ্ধতাই চোখে পড়বে। সেখানে পথিমধ্য থেকে যাত্রী তোলার দরকার হয়না বিশেষ করে লং রুটের বাসগুলোর ক্ষেত্রে। আর যারা ট্রিপ প্রতি নির্দিষ্ট অংকের টাকা মালিক পক্ষের নিকট টাকা জমাদানের শর্তে বাস চালায় তাঁদের দেখা যায় বিভিন্ন রকম খরচ এবং সড়কের নির্দিষ্ট জায়গায় নামে বেনামে চাঁদা দিতে হয়, যা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য হলেও ড্রাইভারদের বেপরোয়া হতে হয়।
অপরিপক্ক বা লাইসেন্স বিহীন চালকদের হাতে কিংবা চালকের সহকারীর হাতে স্টিয়ারিং তুলে দেওয়া বাস ও ট্রাক মালিকদের একটি চরম অন্যায় কাজ। দেখা যায় ট্রিপ প্রতি অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ে মালকরা এসব চালকদের নিয়োগ দিতে পারেন যেটি হওয়া উচিৎ নয়। এজন্য অবশ্যই মালিকদের শাস্তির আওতায় আনা একান্তই দরকার।
জীবিকা নির্বাহের জন্য যারা গাড়ি চালানোকে উপার্যনের উৎস হিসেবে নিয়েছেন এবং কেউ কেউতো ছোটবেলা থেকেই বাস-টেম্পোর সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন যার কারণে কর্মসংস্থানের জন্য মোটরগাড়ি বা গণপরিবহনের বিকল্প ভাবতে পারছেন না বা সেট হতে পারছেন না। এতে করে মালিকদের অন্যায্য দাবী পূরণেও এসব শ্রমিকরা বাধ্য থাকে। ফিটনেসবিহীন বা ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি হালকা মেরামত করে আবার কখনও মেরামত না করেই পরিবহন শ্রমিকদের হাতে তুলে দেন যা নিতে অস্বীকৃতি জানালে হয়ত পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়েই থাকতে হবে। এ চিত্রটি আমরা কয়েকদিনের ছাত্র আন্দোলনের সময়েই দেখেছি, আগেও দেখেছি যখন বড়মাপের হরতাল কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি যে কোন মুহুর্তেই অনেকগুলো তাজা প্রাণ নিয়ে নিতে পারে সেদিকে চিন্তার প্রসার ঘটাতে চাননা মালিকরা। অভিযোগ রয়েছে অনেক পরিবহন শ্রমিকই নিয়মিত নেশাদ্রব্য গ্রহন করেন। অনেক সময় তারা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালান যে কারণে মানসিক ভারসাম্যতা হারিয়েও দূর্ঘটনা ঘটাতে পারে।
ছেলেমেয়েদের চলমান আন্দোলনের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়কে দেড় ডজন বা তার বেশী প্রাণ ঝরে গেছে। সরকার বলে যাচ্ছে তারা শিক্ষার্থীদের সকল দাবী মেনে নিয়েছেন। জাতিও দেখতে পাচ্ছে মেনে নেওয়ার পরেও কিভাবে আরো প্রাণ ঝরে যায়। একটি কথা না বললেই নয়  অনেক সময় পরিবহন শ্রমিক ও ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বরত সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে সম্পর্ক অর্থের অংকে পরিমাপযোগ্য। আর এ সম্পর্কের কারণেই পরিবন শ্রমিকরা বিধি লঙ্ঘন করার পরেও পার পেয়ে যান। পরিবহন শ্রমিকরা এর নাম দিয়েছেন ‘ধান্দা’। এই ‘ধান্দা’ থেকেও জাতিকে উদ্ধার করতে হবে।
আমরা যারা যাত্রী সাধারণ আছি তারা রাস্তা পার হওয়ার জন্য কোন রকম আইন মানিনা, জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে নিজেরাই ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করে করে রাস্তা পার হই যা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অনেকসময় পিকনিকে যাওয়া বা আসার পথে বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে বা রাস্তার কিনারে পড়ে যায় কারণ ওই বাসের মধ্যে যাত্রীরা আনন্দ করার ক্ষেত্রে নিজেদের  নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
কিছু গাড়ি চালক রয়েছেন যারা সত্যিকার অর্থেই নিজের পেশাদারিত্বকে সম্মান করে দায়িত্ব পালন করে যান, মালিকরাও কখনও অন্যায় পথে বা অন্যায় ভাবে যে কারো হাতে নিজের পরিবহনটি তুলে দেন না। তবে এদের সংখ্যা হাতে গুনে বের করা যায়। পরিবহন শ্রমিক, মালিক, যাত্রী, পথচারী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতনতার স্বাক্ষর রাখতে হবে অন্তত আত্মসম্মান বজায় রাখার জন্য হলেও; প্রত্যেককেই আইন ও বিধিমালার প্রতি সম্মান রাখতে হবে। এতেই আমরা নিরাপদ সড়ক পেতে পারি।


লেখক: মু. মিজানুর রহমান মিজান
শিক্ষার্থী: সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা     
ইমেইল: mizanur.r.mizan@gmail.com
ছবি: সংগ্রহ করা হয়েছে
Previous Post Next Post