যে কারণে কোটা সংস্কার প্রয়োজন

আমাদের দেশে সাধারণত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য অধিকাংশ বেকারই সরকারি চাকুরিতে যেতে চায়। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন রকম কোটার সমাহারের কারণে যোগ্যতা থাকা সত্যেও চাকুরি পায়না বেকারদের একটি বিশাল অংশ। অপরদিকে অযোগ্য হওয়া বা যোগ্যতা অপেক্ষাকৃত কম থাকা সত্যেও কোটা সুবিধা নিয়ে ভাল ভাল ও গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকুরি পেয়ে যাচ্ছে অনেকে। এটি বৈষম্য ছাড়া আর কী হতে পারে? সারাদেশে ছাত্রদের থেকে দাবি উঠেছে সরকারি চাকুরিতে কোটা সংস্কারের। সময় এবং পরিস্থিতির বিচারে এটি যৌক্তিক একটি দাবি বলেই দেশের একটা বড় অংশ মানছেন। আমাদের দেশের সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে যে কোটাগুলো রয়েছে তা বিসিএস ক্যাডারের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠী কোটা ৫ শতাংশ এবং কোন কোটায় যখন উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে না পাওয়া যায় তখন ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা পুরণ করা হয়; ১০০ ভাগের মধ্যে যখন ৫৫-৫৬ ভাগ যখন কোটা থেকে পুরণ করা হয় তখন দেশের মেধাবীরা কী করবে? এদের জন্য কি ৪৪ শতাংশ যথেষ্ট? নন ক্যাডারের ক্ষেত্রে নারী কোটা আরো ৫ শতাংশ বেশি। ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির পদের ক্ষেত্রে কোটা ৭০ শতাংশ। পোষ্য কোটাও আছে। বাংলাদেশের মত জনবহুল দেশে প্রকৃত বেকার যখন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার তখন অন্তত এমন বৈষম্য থাকা অনুচিত।

কোটা ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়েছে শুধুমাত্র অনগ্রসর মানুষদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশে কি খেঁটে খাওয়া মানুষ তথা কৃষক, দিন মজুর, কামার, কুমোর, জেলে, ধোপা, নাপিত অবহেলিত ও অনগ্রসর মানুষের জন্য কোন রকম কোটা ব্যবস্থা করা হয়েছে?আমরা যদি মুক্তিযোদ্ধা কোটার দিকে তাকাই তবে দেখব এ কোটা রাখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এক রকম সম্মান হিসেবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানসহ নাতি-নাতনিরা এ ধরণের কোটা সুবিধা পান বর্তমানে। সবার মতো আমিও মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, এ ধরনের কোটা ব্যবস্থার দরকার আছে কিন্তু সেটি বিবেচনা সাপেক্ষে স্বল্প হারে। দেখা যায় কোন এক মুক্তিযোদ্ধার পরিবার সমাজে খুব ভাল অবস্থানে রয়েছে, একটি চাকরি ছাড়াও এসব পরিবারগুলো দিব্যি চলে যেতে পারে কিন্তু অপর দিকে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন যারা সামজিকভাবে খুব ভাল একটা অবস্থানে নেই কিংবা তাঁদের দু’বেলা খেতেও অনেক কষ্ট হয়। এখন চাকুরির ক্ষেত্রে কোন পরিবারের সন্তানের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ? আমার দৃঢ় বিশ্বাস- কোন মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া এটি নয় যে, প্রতিযোগিতার মাঠে তার সন্তান কিংবা অন্য যে কেউ কোন রকম অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যাবে কিংবা সুবিধা নিয়ে আধিপত্য বিস্তার করবে। কারণ তাঁরা জানেন এটি বৈষম্য। আবার দেখা যায় কোন কোন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুঁড়ায় কিন্তু এসব পরিবারের খবরও কেউ রাখেনা, উল্টো ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যত দৌড়ঝাঁপ। আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যাতে করে কোন মুক্তিযোদ্ধা কিংবা মুক্তিযোদ্ধার পরিবার যেন কখনো কোন অসুবিধায় না পড়ে, এটি আমাদের পবীত্র দায়িত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম। কর্সংস্থানে প্রবেশের জন্য দেশে যে নারীকোটা রাখা হয়েছে তার পেছনে অন্যতম একট যুক্তি বা কারণ হল- নারীরা অনেকাংশে অবহেলিত এবং বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে যুগযুগ ধরে যে কারণে জনসংখ্যার এ বিশাল অংশটিঅনগ্রসর। এবং এই অনগ্রসরতা এবং বৈষম্য রোধ করার জন্য সরকার নারী কোটা চালু করেছে। কিন্তু আমার মনে হয় বর্তমানে নারী কোটা এক ধরণের অভিশাপ। যুগযুগ ধরে চলে নারী বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে সে কথা আমাদের অস্বীকার করার উপায় নেই কিন্তু তার খেসারত কেন বর্তমান প্রজন্মকে দিতে হবে কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে। সবাই চায় নারীরা এগিয়ে যাক, নারীরাও যাচ্ছে। এটি শুভলক্ষণ কিন্তু তাদেরকে চাকুরি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে আরেকটি বড় অংশের প্রতি কি অবিচার করছেন না দেশের নীতিনির্ধারকরা? নারী সমাজ এখন বিভিন্ন জায়গায় নিজ যোগ্যতাবলে জায়গা করে নিচ্ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষকে হারিয়ে বিজয়ের ট্রফি ঘাড়ে তুলছে ঠিক এমন সময় চাকুরি ক্ষেত্রে নারী কোটা থাকা নারীদের জন্যই এক রকম অপমানস্বরুপ। আমরা দেখেছি যারা জেন্ডার নিয়ে কথা বলে থাকেন কিংবা গবেষণা করে থাকেন তাঁরা কেউই বৈষম্যকে সমর্থন করেন না। তাঁরা উভয়কেই অর্থাৎ নারী এবং পুরুষকে একই ভাবে দেখে থাকেন। বাংলাদেশের নারীরা এখন খুব একটা পিছিয়েও না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, “কেবল ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবেনা।” এসব কথার পরেও বাস্তবতার দিকে চোখ দিলে আমরা নারীকে দুর্বল হিসেবেই পিছিয়ে পড়া বলে চিহ্নিত করতে পারি যে কারণে নারী কোটার দরকার আছে কিন্তু পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটে ১০ শতাংশের মতো এত বেশি হওয়া উচিৎ নয়। নারীদের অনেকেই কিন্তু কোটা নির্ভরশীল নন, এটি আমাদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে।ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠী কোটাও রাখা হয়েছে তাঁদের অনগ্রসরতার যুক্তিতে। কিন্তু মোট জনসংখ্যার ১ ভাগের একটু বেশি মানুষের জন্য ৫ ভাগ কোটা কতটা যৌক্তিক যখন পুরোদেশ চাকুরি খড়ায় ভুগছে? প্রতিবন্ধী কোটা সম্পর্কে আলাদা করে বলা নিষ্প্রয়োজন, এটির দরকার আছে এমনকি সেটি অন্যসব কোটা পূরণ না হওয়ার শর্তে নয়। কিন্তু জেলা এবং পোষ্য কোটা কিসব কারণে রাখা হয়েছে সে সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য কোন যুক্তি কেউ উপস্থাপন করতে পারবেন কিনা জানিনা।দেখা যায় কোটাধারীদের একটি অংশ ৩২ বছরেও চাকুরিতে প্রবেশের সুযোগ পায়, যেখানে সাধারণের চাকুরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছরপর্যন্ত। একি আরো একটি বৈষম্য নয়? এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চাকুরির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে।

সংবিধানের ১৯ (১) এ বলা হয়েছে, সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবে; ২৯ (১) এ বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের ক্ষেত্রে সুযোগের সমতা থাকবে; ২৯ (২) এ বলা আছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভে অযোগ্য হবেন না কিংবা সেক্ষেত্রে তাঁর ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবেনা।শেষের দিকে একটি কথার উত্তর দিয়ে যেতে চাই। কিছু লোক ভুরূ বাঁকা করে জিজ্ঞেস করেন, কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলনে নামা ছেলেমেয়েরা নিজেদের কতখানি মেধাবী মনে করে যে, এরা বুক ফুলিয়ে নিজেদেরকে মেধাবী বলে পরিচয় দিচ্ছে? আসলে এখানে মেধাবী বলতে শাব্দিক অর্থমতে আত্মগৌরব করার মত কোন প্রচারণায় লিপ্ত নয় আন্দোলনকারীরা। মেধাবী বলতে এমন কাউকে বুঝিয়েছে যারা চাকুরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাছাই প্রক্রিয়া অর্থাৎ প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলে উত্তির্ণ কিংবা কাগজে কলমে নিজেদের যোগ্য বলে প্রমান করতে পারে। এখানে সমালোচনার বিষয়টি ভিত্তিহীন।সর্বক্ষেত্রে সমতার কথা বলা হলেও রাষ্ট্র অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং জনগণও এটিই ভাবে তবে সত্যিকার অর্থে অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়াদের খুঁজে বের করতে হবে। আর কোটা প্রথার বিলুপ্তি না ঘটিয়ে একে সংস্কার করার পক্ষে মত দিচ্ছেন দেশের বুদ্ধিজীবীরা। আন্দোলনকারীদের দাবী কোটা ১০ শতাংশতে নামিয়ে আনা হলেও সব মিলিয়ে একে ১২ থেকে ১৫ ভাগের মধ্যে রাখাই সর্বোত্তম। আশা করছি পরিস্থিতি বিচারে সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপই নেবে, পাশাপাশি বেকারত্বের হার কমিয়ে আনার জন্য নতুন কিছু করবে।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info
#mizanurrmizan
Previous Post Next Post