সাম্প্রতিক সময়ের ট্রাম্প এবং ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’


আমেরিকার ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প নির্বাচনের পর থেকেই প্রায় সব সময়ই নানান রকম আলোচনা ও সমালোচনায় রয়েছেন। এটাই হওয়ার কথা, তবে এবার একটু ভিন্নভাবে মিডিয়ায় এসেছেন ট্রাম্প। জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি, পাকিস্তানকে কটাক্ষ, উত্তর কোরিয়া ইস্যু এবং ইরানের বিক্ষোভে সমর্থনের পাশাপাশি এক সাংবাদিকের লেখা একটি বইকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আলোচনা ও সমালোচনা বিশেষ রূপ পেয়েছে।
জেরুসালেম ইস্যু নিয়ে কি হয়েছে তা বিশ্ব জানে, ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। এই মুহুর্তে সব কিছুকে পেছনে ঠেলে নতুন করে আলোচনায় আসলেন যথারীতি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের এক বক্তব্যের প্রতুত্তর দিয়ে এবং পাকিস্তানকে কতাক্ষ করে। ট্রাম্প-কিম প্রসঙ্গ অনেকটা পুরোনো হলেও ট্রাম্পের পাকিস্তান প্রসঙ্গ একেবারেই নতুন বলা যায়। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ও মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ১৫ বছর ধরে বোকার মতো পাকিস্তানে ৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সাহায্য দিয়ে এসেছে। যার বিনিময়ে তারা কিছুই পায়নি’। ৩ জানুয়ারি আরো একটি টুইটে বলেন, ‘শুধু পাকিস্তানই নয় ফিলিস্তিনিদেরকেও অকৃতজ্ঞ বলেছেন।
পাকিস্তানকে ট্রাম্প বলছেন জঙ্গিদের সর্গরাজ্য যা পাকিস্তান ভালভাবে নিতে পারেনি স্বাভাবিক ভাবেই। কটাক্ষের দু;দিন বাদেই পাকিস্তানে মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তা বন্ধের ঘোষণা নিয়ে এলো যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। পাকিস্তানে তৎপর জঙ্গী গোষ্ঠী আফগান তালেবান এবং হাক্কানী মিশনের তৎপরতা বন্ধে দেশটির ব্যর্থতার ফলেই এমন সিদ্ধান্ত বলে জানানো হয়। কিন্তু পাকিস্তানতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বলেই পরিচিত, তাহলে কেন এমন সিদ্ধান্ত? এটি নিশ্চয়ই এ সম্পর্কের জন্য বড় একটি আঘাত। তাৎক্ষণিকভাবে ভারত এবং আফগানিস্তান ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছে আর উল্টো দিকে রয়েছে চীন।
কয়েক দিন আগে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন অনেকটা এরকমই বলেছেন, আমারিকা সবসমই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমার আওতায় রয়েছে এবং সেগুলোর সুইচও রয়েছে তাঁর টেবিলেই। এ কথারই প্রতুত্তর হিসেবে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দম্ভ করে বলেছেন তার পরমাণু বোমার সুইচ উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের বোমার সুইচের চেয়ে "অনেক বড়" এবং "বেশি শক্তিশালী'' এটিও যথারীতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট টুইটার ও ফেসবুকেই জানান বিশ্ববাসীকে। ৩ জানুয়ারি, ২০১৮ তারিখে করা ট্রাম্পের এ মন্তব্য কিম ও ট্রাম্পের মধ্যে চলমান বাকযুদ্ধে একটি উস্কানি বলা যেতে পারে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। কিম এবং ট্রাম্পের বক্তব্যকে অনেকে কৌতুকের দৃষ্টিতে দেখলেও বিশেষ তাতপর্য বহন করে। কিন্তু এরকম একটি স্পর্শকাতর বক্তব্য একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ কিভাবে ফেসবুক ও টুইটারের মত জায়গায় প্রকাশ করে? গত বছরের ২২ ডিসেম্বর উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প পূরো বিশ্বকে পদানত করতে চান। পিয়ংইয়ংয়ের অভিযোগ, ওয়াশিংটন চাইছে উত্তর কোরিয়ার শ্বাস রোধ করে দেশটিকে দমন করে আধিপত্য বিস্তারের জন্যে কোরীয় উপদ্বীপকে তাদের একটি আউটপোস্ট বানাতে চায় গত সেপ্টেম্বরে কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প কিম জন উনের সম্পদ জব্দ করতেও চেয়েছিলেন। সর্বশেষ উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন যে, তিনি নাকি কিম জং উনের সঙ্গে দেখা করতে চান; এমন খবরই বের করেছে কিছু গণমাধ্যম। নিঃসন্দেহে এটি পুরো বিশ্বের জন্য সুখবরই বটে যদি তিনি কোন রকম দুষ্টু চালের খেলা না খেলেন। যাইহোক বিষয়টি আপাতত ভবিষ্যতের জন্য ছেরে দেওয়া যেতে পারে। মি. কিমকেও এ ব্যাপারে নমনীয় হতে হবে।
ইরানে চলমান সরকার বিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র। ২৮ ডিসেম্বর ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা তেহরান ও অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ইরানে বিক্ষোভের কারণ হল মূলত‑ খাদ্য দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি এবং নতুন বছরের বাজেটে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির সরকারি প্রস্তাব যা শুরু হয়েছে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানীর বিরোধীতার মধ্য দিয়ে। দেশটিতে ধর্মীয় নেতৃতের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে বলে অনেক মিডিয়া জানায়। ইরানকে উদ্দেশ্য করে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকটা এরকমই লিখেছেন, “দমন পীড়নকারী সরকারকে কখনোই সহ্য করা যায় না। দেশের বাইরের সন্ত্রাসীদের অর্থের যোগান দিতে গিয়ে দেশের যে জাতীয় সম্পদ অপচয় করছে সরকার তারই কারণে দেশটির জনগণ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে।” এ নিয়ে রাশিয়া বলছে, ইরানে চলমান বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে পরমাণু সমঝোতা ধ্বংস করতে চায় আমেরিকা এবং ওই দেশের অভ্যন্তরীণ কোন বিষয়ে যে অন্যদের নাক গলানোর অধিকার কারো নেই সেটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
ইরানে এ আন্দোলন ২০০৯ সালের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলন, তখন আন্দোলন হয়েছিল শুধুমাত্র তেহরান কেন্দ্রিক কিন্তু এখন যা চলছে তা আগের চেয়ে অনেক ভিন্ন। পরমাণু শক্তিধর হিসেবে পরিচিত দেশ ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকে মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বহিরপ্রকাশ ভলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র
‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’তে ট্রাম্প
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে লেখা হয়েছে একটি বই, যার নাম ‘ফায়ার এন্ড ফিউরি : ইনসাইড দি ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ’এটি লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রেরই একজন সাংবাদিক যার নাম‑ মাইকেল ওলফ। লেখক বলছেন, বইটি লিখতে গিয়ে প্রায় ২০০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যার মধ্যে স্বয়ং ট্রাম্পও ছিলেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেখক ওলফের দাবীকে নাকচ করে দিয়ে বলেছেন যে, তিনি নাকি ওই লেখককে কোন সাক্ষাৎকার দেননি। আর মি. ওলফ এনবিসি’কে দেওয়া সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নির্বাচনের আগে ও পরে এবং হোয়াইট হাউসে সব মিলিয়ে ৩ ঘণ্টার মত সময় কাটান। বইটি নিষিদ্ধ করার জন্য ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে কিন্তু বইটি বাজারে ছাড়া হয় জানুয়ারির ৫ তারিখেই; আইনি নোটিশ না পাঠালে হয়তো আরো কিছুদিন দেরী হত বইটি পাঠকের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করার
বইটিতে উঠে আসে বেশ কিছু বিস্ফোরক তথ্য। বইয়ে বলা হয় ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ট্রাম্প জুনিয়রের সাথে রাশিয়ার কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষাৎ হয় ট্রাম্প টাওয়ারে যেখানে ছিলনা কোন আইনজীবি। এই সাক্ষাতে হিলারী ক্লিন্টন সম্পর্কে গোপন কিছু তথ্য প্রদান করে রাশিয়ার কর্মকর্তারা।
নির্বাচনে যখন নিজেকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে পেলেন ট্রাম্প তখন নাকি তিনি সংশয়ে পড়েছিলেন। ট্রাম্প জুনিয়র নাকি তাঁর এক বন্ধুকে বলেছিলেন, তাঁর বাবা বোধ হয় ভূত দেখছিলেন। মেলানিয়ার চোখেও ছিল জল, কিন্তু সেটা আনন্দের ছিলনা! এছাড়া অভিষেকের দিনেও ডোনাল্ড ট্রাম্প খুশি ছিলেন না, স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পের সাথেও নাকি ঝগরা হয়েছিল সেদিন। বইটির লেখক সাংবাদিক উলফ লিখেছেন, হোয়াইট হাউস নিয়ে ট্রাম্প ভীত হয়ে পড়েছিলেন এবং তিনি যে কক্ষটি নিজের শোবার ঘর হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলেন সেটিতে তালা মারতে বলেছিলেন। প্রেসিডেন্টের ভয় ছিল তাঁর খাবারে কেউ বিষ মিশিয়ে দিতে পারে এমনকি টুথব্রাশেও।
ওলফ তাঁর বইতে লেখেন, রুপার্ট মারডক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘গাধা’ বলেছিলেন। সিলিকন ভ্যালির নির্বাহীর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি বৈঠকের আগে রুপার্ট মারডক টেলিফোনে এইচ-ওয়ান বি ভিসার ব্যাপারে বিবেচনার অনুরোধ করেন মি. ট্রাম্প এতে জবাব দেন, “দেখা যাবে”কিন্তু এতে খুশি হতে পারেন নি মারডক এবং ট্রাম্পকে ‘গাধা’ বলে ফোন রেখে দিয়েছেন।
বইটিতে আরো একটি বিষয় এসেছে বলে আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রকাশ করেছে, তা হল‑ সৌদি আরবে মোহাম্মদ বিন নাইফকে ক্রাউন প্রিন্সের পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা এবং ওই পদে মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিয়োগ দেয়ার পিছনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার কলকাঠি নেরেছিলেন। ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’র মতে মোহাম্মদ ভিন সালমান ট্রাম্পের নিজের লোক।
এরকম আরো অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে মাইকেল ওলফের বইটিতে কিন্তু ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন বইটি ভুলে ভরা। ট্রাম্পকে বলা হয়েছে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে অযোগ্য কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে একজন ধীর-স্থীর প্রতিভা হিসেবে ঘোষণা করেছেন, বলছেন তিনি একজন জিনিয়াস। বইটির লেখক বলছেন, ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ ট্রাম্পকে পদত্যাগে বাধ্য করবে।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info
#mizanurrmizan


সূত্র: বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম
Previous Post Next Post