বাংকিউই বালকের বাংলাদেশপ্রেম

নেলসন স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ড বনাম বাংলাদেশের
ক্রিকেট ম্যাচ দেখছে বাবা মায়ের সাথে
বাবাকে দেখে দেখে রাহিল আড়াই বছর বয়সেই থেকেই হারমোনিয়াম ও তবলাতে হাত রাখে, বাবা গান গাইলে সেও গান ধরত যদিও সে তখনও বুঝতোনা গান কী অথবা বাদ্যযন্ত্র কিসের জন্য ব্যবহার করা হয়। কখনও আবার নিজের মত করে সেও গান গাইত যেটি এখন রাহিলের অন্যতম প্রধান একটি সখ।
রাহিলের জন্ম হয় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ২০০৭ সালে, বেড়ে উঠছে ওখানেই। ওর পুরো নাম রাহিল রেদওয়ান উদ্দিন, এভনহেড স্কুলের সিক্স ইয়ার’এর ছাত্র। সিক্স ইয়ার হল আমরা যাকে বাংলাদেশে ষষ্ঠ শ্রেণি বলি। কথা বার্তায় খুব স্মার্টনেসের পরিচয় দেয়, কথা শুনলে মনে হবে ছেলেটা বোধ হয় ছোটখাটো একজন বিশ্লেষক কিংবা সমালোচক।
ভিন্ন দেশের ভিন্ন পরিবেশে থেকেও ১০ বছরের এ বালক ভালই বাংলা বলতে পারে। বাংলা গান রাহিলের অনেক প্রিয়। বাসা, স্কুল থেকে শুরু করে ওই দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাংলা গান ও অভিনয় দিয়ে মাতাতে অনেক বেশি পছন্দ করে। স্কুলের কোন এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রথম যেদিন গান করে সেদিনই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ গেয়ে শোনায়। শুধু গান শুনেই নিজেকে মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেয়নি নিজেকে, এটি সম্পর্কে দর্শক-শ্রোতাদেরকে ইংরেজিতেও গানটি বুঝিয়ে দেয়। এতে খুব প্রশংসা পায় রাহিল। ধীরে ধীরে ও বাংলা গান দিয়ে অনেকেরই ভালবাসা ও পেয়েছে। মোটামুটিভাবে কোন ছোটখাট জটলা বাঁধলেও সেখানেও ছেলেটা বাংলা গান দিয়ে অন্যদের তৃপ্তি মেটায়। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জনও ওকে পেলেই বাংলা গান শুনতে চায় আর রাহিলতো এটাই চায়। ইংরেজি ছাড়াও নিউজিল্যান্ডের অফিসিয়াল ভাষা মাওরি এবং সাইন ল্যাগুয়েজেও ওর দখল রয়েছে তবে সাইন ল্যংগুয়েজে কিছুটা কাঁচা। বাংলা, ইংরেজি এবং মাওরি তিনটি ভাষাতেই সঙ্গীত চর্চা করলেও রাহিল বলে বাংলা গান কেনই যেন ওর ভাল লাগে। আমি বাংলায় গান গাই, মাঝি নাও ছাইড়া দে, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, রাঙামাটির রঙে চোখ জুড়ালো, সোনার মেয়ে, মাগো ভাবনা কেন ইত্যাদি গানই যেন ওকে সব সময় টানে। নিজের কি-বোর্ডের থেকে বেশি সময় কাটায় বাবার বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হারমোনিয়াম ও তবলাতে। পিয়ানো বাজানোতেও রাহিল ওস্তাদ, স্কুলে কিংবা অর্কেস্ট্রাতে সে এটা বাজায়।
মিউজিক ক্লাসে রাহিল
ইদানিং ওর মনে হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের মানুষকে বাংলাদেশ সম্পর্কে, বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে, বাংলাদেশের বিভিন্ন উৎসব সম্পর্কে জানানো দরকার আর এজন্যই বাবার সহায়তায় নিজের ইচ্ছায় বাংলা গান শিখছে, বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে জানতে চায় যা সে ওখানের বন্ধুদের কাছে, শিক্ষকদের কাছে, আশেপাশের মানুষদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে বলে। সে এখন জানে একমাত্র বাংলাদেশের মানুষই মাতৃভাষা রক্ষার্থে প্রাণ দিয়েছে, এমন নজির আর কোথাও নেই; এ কথাও নিউজিল্যান্ডের পরিচিতজনদের কাছে বলতে ভোলে না। বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে রাহিল অনেক খবর নিচ্ছে, ইন্টারনেটে তথ্য সংগ্রহ করে তা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে। রাহিল অনেকটা এরকমই বলে- “আমার দেশ নিয়ে, আমার সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে আমার যেমন ভাল লাগে তেমনই এটা আমার দায়িত্ব, আমার দেশকে অন্যের কাছে তুলে ধরার চেয়ে আর বড় কাজ আছে কিনা তা আমি এখনও শিখতে পারিনি; আমি ঠিক বলতে পারছিনা নিউজিল্যান্ডে থেকেও ওই জায়গাটাতে নিজেকে তেমন সুখী ভাবতে পারছিনা, ওখানে আমি শুধু আমার ফ্রেন্ডদের খুশি, আর কিছুতে নয়”। ওকে না দেখলে হয়ত কেউই বিশ্বাস করতে চাইবেনা যে কিশোর বয়স ঠিকমত পা রাখেনি এমন একটি ছেলে এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে। ক্রিকেট নিয়ে তেমন আগ্রহ না থাকলেও দেশের আন্তর্জাতিক কোন ম্যাচ সহজে এড়িয়ে যেতে চায়না, সর্বশেষ যখন নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ খেলতে গেল তখন সে জার্সি গায়ে চেপে পতাকা হাতে নিয়ে মাঠে গিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছে। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ট্রফির নিউজিল্যান্ড ভ্রমন উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও ‘তাকধুম তাকধুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’ গানে নৃত্য পরিবেশন করেছে যা ব্যপক প্রশংসিত হয়।
তবলা বাজানোর সখ দুই বছর থেকেই

বাবা এবং মায়ের সাথে বরাবরের মত একদা বাইরে বের হয়েছিল। একটা মার্কেটে ঢোকার পরে ছেলেটার ইংরেজিতে কথা বলার ভঙ্গি দেখে নিউজিল্যান্ডেরই একজন জিজ্ঞেস করেন রাহিল আমেরিকান কিনা। তখন ও বাংলাতে বলে, “আমি বাঙালি”। আরো একদিন এমন আরেকটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে রাহিল বলে, “আমাকে নিউজিল্যান্ডের মানুষ বললে আমার খারাপ লাগে। বড়জোর আমাকে ‘বাংকিউই’ বলা যেতে পারে”।
একদিন চা খেতে খেতে আমি এবং আমার এক শিক্ষক রাহিল এবং রাহিলের বাবার সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কথা প্রসঙ্গে আমার শিক্ষক ওকে জিজ্ঞেস করেন একই প্রশ্ন করেন, “তোমার জন্মতো নিউজিল্যান্ডে, এখন তুমি নিজেকে কোন দেশের বলে দাবী কর?” এ প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, আমার জন্ম ওখানে কিন্তু টেকনিক্যালি আমিতো বাংলাদেশি!” ও যে এরকম একটা উত্তর দিবে তা ছিল আমাদের চিন্তার বাইরে। জন্ম থেকে একটা দেশে থাকার পরও ওখানের অনেক কিছুই ওর সাথে অনেক কিছুই জড়িয়ে যেতে পারেনি, সে সবসময়ই নিজেকে একজন খাটি বাঙালি হিসেবেই দেখতে চায়।
গত অক্টোবর মাসে নভেম্বরের মধ্যে স্কুল থেকে যেকোন একটা বিষয়ের ওপর ফিকশন জমা দিতে বলা হয় রাহিলের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের। স্কুল থেকে কোন রকম টপিক বেছে না দেওয়াতে রাহিল ও বাবাকে বলে, “বাবা আমি আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর আমার ফিকশনটি করতে চাই, আমাকে হেল্প করতে হবে”। বাবা এতে অনেক খুশি হলেন, এবং বিভিন্ন রকম সহায়তাও করলেন আর এতেই রাহিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর নিজের প্রথম ফিকশন ‘দ্য আননোটিসড ফ্রিডম ফাইটার্স’। স্কুল থেকে বিশেষ পুরস্কার জিতেছে ফিকশনটি। ‘দ্য আননোটিসড ফ্রিডম ফাইটার্স’ লিখতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে যেগুলো ওর পূর্বে জানা ছিলনা। স্কুলেও মোটামুটিভাবে একটা জায়গা দখল করে আছে। সহপাঠী, শিক্ষক এবং অন্যদের কাছে এক রকম আদরেই থাকে। এ পর্যন্ত আইকাস (ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন্স অ্যান্ড এসেসমেন্টস ফর স্কুলস) রাহিল স্কুল থেকে মোট ৬ টি ব্যান্ড অর্জন করেছে যার ৫ টিই হল এক্সেলেন্সের আর অন্যটি হল রেসপন্সিবিলিটির জন্য। গণিতেও রয়েছে অসামান্য দক্ষতা যা সম্পর্কে স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে লেভেল ৩০ এর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে লেভেলের গনিতের প্রত্যাশা করছে দেশটি সে মাপেরই দক্ষতা সে অর্জন করে ফেলেছে।
বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ট্রফি ট্যুরে বাংলাদেশের ঢোল গানে নাচছে রাহিল

কিছুদিন আগে ওরা বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশে এসে এখানের বিভিন্ন রকম সমস্যা ওকে ভাবিয়ে তুলেছে। তবে সব থেকে বেশি ভাবাচ্ছে এদেশের ট্রাফিক জ্যাম এবং আশেপাশের চলাফেরার জায়গাগুলোতে ময়লা-আবর্জনায় নোংরা হয়ে থাকা। “আসলে আমাদের দেশেতো অনেক মানুষ তাই হয়ত এরকম হচ্ছে, চিন্তা করছি কিছু একটা করাতো দরকার।”- এগুলো বলছিল রাহিল আর আমরা সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, কিছুতো একটা করা দরকার।
মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info
#mizanurrmizan


(প্রধান অংশ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত, জানুয়ারি ১, ২০১৮)
Previous Post Next Post