স্বপ্ন দেখুন, স্বপ্ন দেখান

পত্রিকা খুললে প্রায়ই দেখা যায় প্রেমের টানে কিশোরী ঘর ছাড়া, প্রেমের প্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে কিশোরীকে ছুড়িকাঘাত, বখাটের হাতে কিশোরী খুন, আত্মহত্যা করল কিশোরী ইত্যাদি। কিশোরী ছাড়াও কিশোরদের ঘিরেও নানান অপ্রত্যাশিত খবর বেরোয় মিডিয়াতে, কেউ কেউ খুন-ধর্ষণের মত দ্বিধা করেনা। এরপরও আমি ওদেরকে দোষ দেবনা; যদিও এসবকে প্রশ্রয় দেওয়া মহাপাপের সামিল ও ধ্বংসাত্মক কিছু।

একটা শিশু জন্মের পর থেকেই সে পরিবার ও সমাজের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। ধীরে ধীরে সে পরিবার ও সমাজ থেকেই প্রকৃত শিক্ষা লাভ করে। সে অনুসরণ করে তার আশে পাশে থাকা মানুষগুলোকে, বর্তমান যুগে শিশুর মানসিক বিকাশে টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, কম্পিউটারও অসামান্য ভূমিকা রাখছে। শিশুরা টেলিভিশনে যেমন কার্টুন দেখছে, তেমনই বড়দের সাথে বিভিন্ন রকম নাটক, সিনেমা, মিউজিক ভিডিও ইত্যাদি দেখে অভ্যাস্ত। এসব থেকেও তারা শিখছে। এছাড়া আমরা সকলেই বয়সন্ধিকাল সম্পর্কে জানি। এ সময় ছেলেমেয়েদের আচরণের বেশ কিছু বিশেষ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে‑ বিপরিত লিঙ্গের বন্ধুবান্ধবের প্রতি আগ্রহ, অস্বাভাবিক চিন্তা চেতনা, সিদ্ধান্থীনতা, বন্ধুবান্ধবদের সাথে অবাধ মেলামেশাসহ অনেক সময় সঙ্গদোষে অপ্রত্যাশিত ও আপত্তিকর কাজ করে ফেলা। কৌতূহলবসত ধূমপান ও মাদকাশক্তি এমনকি অনিরাপদ যৌনাচারসহ নানান অসামাজিক কাজে লিপ্তও হতে পারে। এসব দিক বিবেচনায় নিলে লেখার প্রথমেই যে সকল অপরাধমূলক কাজের কথা বলেছি তা হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়, তবে অপ্রত্যাশিত।
আমাদের সমাজের একটা দোষ আছে‑ যখন কোন অপরাধ সংক্রান্ত কিছু ঘটে তখন যিনি ঘটিয়ে থাকেন তাকেই কেবল অপরাধী মনে করি কিন্তু এসবের পেছনে যে কোন ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সমাজের পরোক্ষ হাত থাকে সেটা ভেবে দেখিনা। আমাদের চোখের সামনে যে লোকটি অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত তার পেছনেও যে কিছু অপরাধী থাকতে পারে যাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্ররোচনায় অপরাধমূলক কর্ম হচ্ছে তা আমরা কখনোই ভাবতে রাজী না আমার চোখে প্ররোচনা প্রদানকারীরাই প্রধান অপরাধী, আর যিনি শেষ পর্যন্ত কর্মটি করে থাকেন তিনি গৌণ যেহেতু প্ররোচনা বিহীন কোন অপরাধই সংগঠিত হয়না বলেই মনে হয়। যে কিশোরী আজ ঘর ছেড়েছে হয়ত তার হিসেবে সে ঠিক কাজই করেছে কিন্তু সমাজ একে অপরাধের খাতায় লিখেছে। মেয়েটি যার জন্য ঘর ছেড়েছে, যাদের জন্য ছেড়েছে, যে কারণে ছেড়েছে সেটি আমরা দেখিনা। এরপকমই একটা কিশোর কিংবা পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রেও। এরা যখন ইভটিজিং, ধর্ষণ কিংবা অন্যান্য অপরাধে জড়ায় তখন ধরেই নিতে হবে যে এসব একার পক্ষে করা সম্ভব নয়।
আমি কখনোই অপরাধ ও অপরাধীর পক্ষে সাফাই গাইনা, কিন্তু অপরাধের উৎস না জেনে কাউকে শাস্তি পেতে হলে সেখানে নিজেকেই নতুন করে অপরাধী মনে হয়। শুভ যেকোন কিছুর ভাগ একটা সমাজ নিতে সর্বদা প্রস্তুত, অথচ অশুভ কোন কিছুর সৃষ্টি হলে সে দায় সমাজ নিতে নারাজ।
স্বল্প চিন্তায় মাথায় যা আসলো তাতে মনে হয় আমরা যারা সমাজে আছি তাঁরা নিজেরাও যেমন স্বপ্ন দেখতে পারিনা, তেমনই অন্যকেও দেখাতে পারিনা‑ এটা অপরাধ কর্মের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। যেমন, ছোটবেলাতে যখন কোন বাবা-মা তাঁর সন্তানকে বলবে ‘তোমাকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে হবে’, তখন কিন্তু ওই ছেলে কিংবা মেয়ের মগজে কেবল দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চিন্তাই ঘুরবে, সে মানুষকে একজন প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, প্রধানমন্ত্রীর কাজ ও আদর্শ সম্পর্কে জানতে চাইবে, কিভাবে প্রধানমন্ত্রী হতে হয় তা জানতে চাইবে ইত্যাদি। মোটকথা মনের মধ্যে একটা স্বপ্নগাঁথা হয়ে যাবে, সে একটা লক্ষ্য নিয়ে চলবে ঠিক এরকমই অভিভাবক, শিক্ষক বা সমাজের অন্য সদস্যরা যদি ছোটছোট বাচ্চাদের মধ্যে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ডাক্তার, ইঙ্গিনিয়ার, খেলোয়ার ইত্যাদি হওয়ার স্বপ্ন স্থাপন করে দিতে পারেন তাহলে বোধহয় এসব বাচ্চারা যখন একটু বুঝতে শিখবে তখন হতে তাদের দ্বারা ভবিষ্যতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড খুব একটা হবেনা, এটা আমার বিশ্বাস। একটি স্বপ্নহীন মানুষ যেকোন দিকে ছুটতে পারে; উল্টোভাবে যে মানুষটি বিশেষ স্বপ্নকে লালন করে পথ চলে তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান ওই একই দিকে থাকে তাঁর মধ্যে অপরাধ প্রবনতা তেমন দেখা যায়না। কিশোর-কিশোরীদের মনেও একই ভাবে প্রত্যাশিত প্রবনতা গেঁথে দেয়া যেতে পারে। ওদেরকে বোঝাতে হবে‑ ওরা পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য একেকটা অমূল্য রতন; ওদের অনেক কিছু করার রয়েছে এসবের জন্য।  পরিবার, সমাজ ও দেশ ওদেরকে অনেক দিয়েছে এবং দিচ্ছে, এর প্রতিদান প্রতিদান কিছুটা হলেও দিতে হবে যদিও এসবের ঋণ শোধ করার মত নয়।
সবার প্রতি আমার একটিমাত্র অনুরোধ‑ দয়া করে নিজে স্বপ্ন দেখুন, অন্যকে স্বপ্ন দেখান। প্রতিজ্ঞা করুন আপনি অন্তত আপনার পরিবারের জন্য ভাল কিছু করার চেষ্টা করুন, অন্যের বিপদে এগিয়ে যেতে সম্ভব না হলেও কারও ক্ষতি করবেন না। বাবা-মা ও অন্যরা কষ্ট পাক এমন কিছু থেকে বিরত থাকতে পারলেই আমরা অপরাধ মুক্ত থাকতে পারব।

মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info
#mizanurrmizan


(প্রবন্ধটি ডিসেম্বর ২১, ২০১৭ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত)
Previous Post Next Post