ডোনাল্ড ট্রাম্পের এশিয়া সফর

ফিলিপিন্সে পা রাখতে না রাখতেই সেখানের শত শত মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসেন, ট্রাম্পের এ সফরকে তারা ভালভাবে নিতে পারেননি। রাস্তায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা পুড়িয়ে এর প্রতিবাদ জানান উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচী নিয়ে যখন সারা বিশ্বে হৈচৈ লেগে আছে তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়া সফরে এলেন। গত ৫ নবেম্বর জাপানে পা রাখার মধ্য দিয়ে তিনি এ সফর শুরু করেন।


Credit...Doug Mills/The New York Time

১৯৯১-৯২ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এসেছিলেন ১২ দিনের সফরে যার প্রায় ২৫ বছর পর অপর এক প্রেসিডেন্ট এশিয়াতে দীর্ঘতম সফরে এলেন। বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, এ সফরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাণিজ্যকেই বেশি গুরুত্ব দেবেন। উত্তর কোরিয়া ইস্যুকেও যে তুলে ধরতে চাইবেন সেটাও বলেছে অনেক সংবাদ মাধ্যম। উত্তর কোরিয়াও ট্রাম্পের সফর নিয়ে বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছেন বলে অনেকে মনে করেন, দেশটি বলছে ট্রাম্প একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যই এই সফর করছেন। সফরের শুরুতে বিমানে বসেই ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের নেতাদের সঙ্গে রাশিয়ার পুতিনকেও পাবেন। যদিও সেখানে তিনি দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেননি, তবে সময় এসব দেশকেই বোঝাচ্ছে। কথাটি ভেঙ্গে না বললেও করা যায়, উত্তর কোরিয়া সম্পর্কেই কিছু একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন; কেউ বলেন এটা নিছক বাণিজ্য সম্পর্কিত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প জাপানের পথে হাওয়াইতে যাত্রা বিরতি করেছিলেন, সেখানে তিনি ইউএসএস এরিজোনা মেমোরিয়াল পরিদর্শন করেন যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বপযুদ্ধে জাপান হামলা করেছিল; এটি এক ধরনের নীরব বার্তা বহন করছে না তো জাপানের জন্য? শিনজো আবে অবশ্য জাপানকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবেই প্রমাণ করতে চেষ্টা করছেন সব সময়। কিন্তু ট্রাম্প যে, আমেরিকা ফার্স্ট নীতির প্রচারণা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে করছেন সে নিয়ে জাপান নিশ্চয়ই সমকণ্ঠি নয়, এটা বলাই যায়।

জাপানের পর ৭ নবেম্বর পা রাখেন সিউলে। ২৪ ঘণ্টার সফরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন-জায়ে ইনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়া নিয়ে কথা বলেছেন। এ ছাড়া সেখানে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীদের সঙ্গেও সাক্ষাত করেন। সিউলে যে তিনি পিয়ংইয়ং নিয়ে কথা বলবেন সেটা অনুমিতই ছিল।

চীন সফরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়াকে, অনেকেই মনে করেন এতে করে চীনের লাভ হয়েছে। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় ১২টি দেশের মধ্যে এই চুক্তিটি হয়েছিল, তবে চুক্তিটি এখনও চালু হয়নি। দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, কানাডা চিলি, জাপান, মালয়েশিয়া মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, পেরু, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম। ধরা হয় বিশ্ব অর্থনীতির ৪০ ভাগই এই দেশগুলোর দখলে। ৮ নবেম্বর বিকেলে ট্রাম্প চীনে পৌঁছলে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়, যেটি বারাক ওবামার সফরে করা হয়নি। দুদেশের মধ্যে ২০টি বাণিজ্যিক চুক্তি হয় যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান। বিশ্বের মানুষ জানে যে, ট্রাম্প ফেসবুক ও টুইটারে সরব। আর চীনে ফেসবুক ও টুইটার নিষিদ্ধ থাকার কারণে অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন যে, ট্রাম্প সে দেশ বসে ফেসবুক কিংবা টুইটারে লগ ইন বা পোস্ট/টুইট করতে পারবেন কিনা। কিন্তু তিনি তার বহনকারী বিমান থেকে যে কোন জায়গা থেকেই ফেসবুক ও টুইটারে পোস্ট করতে পেরেছেন।

এরই মধ্যে আবারও বাগযুদ্ধে মেতেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। নতুন দফার এই বাগযুদ্ধের সূচনা ঘটান উত্তর কোরিয়ার নেতাই। তিনি ট্রাম্পকে বুড়ো বলে আখ্যায়িত করেন, যেটি প্রকাশ করে উত্তর কোরিয়ার কেসিএনএ। এর পরই কিমকে বেঁটে ও মোটা বলে খোঁচা দিয়েছেন ট্রাম্প। এ সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভিয়েতনামের হ্যানয়েতে অবস্থান করছেন। এর আগেও কিম ও ট্রাম্পের মধ্যে এমনটা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার নেতাকে পাগল ও রকেট মানব হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন ট্রাম্প, জবাবে বিপরিত পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে উন্মাদ বলেছিলেন। ১১ নবেম্বর ট্রাম্প তার ফেসবুক পেজে লিখেন, কিম জং উন কেন আমাকে বুড়ো বলে অপমান করবেন, আমি তো তাকে কখনই বেঁটে আর মোটা বলিনি? আমি তার বন্ধু হওয়ার খুব চেষ্টা করেছি এবং হয়ত কোন একদিন তা হবে! একই কথা তিনি টুইটারেও লিখেন। ভিয়েতনামের রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই টুইটের ব্যাপারে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ট্রাম্প বলেন, বন্ধুত্বের বিষয়টি অবিশ্বাস্য হলেও তা পুরোপুরি অসম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, যদি তা হয়, আমি উত্তর কোরিয়ার বন্ধুপ্রতিমই হব; জানি না, এটা হবে কিনা, হলে খুবই খুবই ভাল হবে।

সফরে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বিরোধ মেটাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কয়েকটি দেশের মধ্যকার বিরোধ মেটাতে তিনি প্রস্তুত আছেন। চীন ওই সাগরের ওপর নিজের বলে দাবি করে আসছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে চীনের। দক্ষিণ চীন নিয়ে চীনসহ মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, ফিলিপিন্স ও তাইওয়ানের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরকে অন্যতম ব্যস্ত একটি জলপথ হিসেবে ধরা হয়। প্রতিবছর ওই পথে লাখো কোটি ডলারের পণ্য নিয়ে নৌযান চলাচল করে। সেখানে বিতর্কিত জলসীমায় সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে চীন। কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনও করে চীন। দেশটির হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে ওই এলাকায় মার্কিন রণতরী টহল দিয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের বাগযুদ্ধ হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের অবস্থানকে সমস্যা হিসেবেই মনে করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তিনি ট্র্যান দাই কুয়াংয়ের কাছে অধ্যস্থতা করে দেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টও শান্তিপূর্ণ সমঝোতা ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে এই বিরোধের মীমাংসা চান। কিন্তু ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো ডুটারটে বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ না করাই ভাল। ডুটার্টে চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের পর থেকে ভিয়েতনামই হয়ে উঠেছে ওই অঞ্চলে চীনে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। গত জুলাইতে ভিয়েতনামকে সাগরের বিতর্কিত এলাকায় তেল উত্তোলনের কাজ বন্ধ রাখার জন্য চাপ দিয়েছিল চীন। তখন দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি হয়। কথা রয়েছে এই সপ্তাহে ভিয়েতনাম যাবেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। সেখানে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ট্রাম্পের চীন সফরের সময়ও দুই দেশের মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর দিয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। এ সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কমিউনিস্ট দেশ ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি, পরিবহন যোগাযোগ ও বিমান কেনাসহ বেশকিছু চুক্তি করেছে। এর মধ্যে ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের ১৫০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান থেকে ইঞ্জিন এবং অন্যান্য সেবা নেবে।

১৩ নবেম্বর আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের ৫০তম বার্ষিকীতে ৩১তম সম্মেলনে যোগ দিতে ১২ নবেম্বর ফিলিপিন্সে পা রাখেন ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন রয়েছেন ফিলিপিন্সে, সেখানে তিনি আসিয়ানের ৫০তম বার্ষিকীতে বক্তৃতা করবেন। তবে ফিলিপিন্সে পা রাখতে না রাখতেই সেখানের শত শত মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসেন, ট্রাম্পের এ সফরকে তারা ভালভাবে নিতে পারেননি। রাস্তায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা পুড়িয়ে এর প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে উঁসঢ় ঞৎঁসঢ় ও উড়হি রিঃয ঃযব টঝ ওসঢ়বৎরধষরংস লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। ম্যানিলাতে রদ্রিগো ডুটারটের সঙ্গে ডিনার করেন। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ক্রমে ক্রমে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন, ৫ম ইউএস-আসিয়ান সামিটে অংশ নেন এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অপর একটি বিশেষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। এর আগে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সৌজন্য সাক্ষাতের সময়।

সব ছাপিয়ে একটি টার্ম নিয়ে বিশ্ব নাগরিকদের মনে এক রকম ধোঁয়াশা রয়ে গেছে, সেটি ইন্দো-প্যাসিফিক। এ টার্মটি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সফর সঙ্গীরা বার বার ব্যবহার করেছেন এই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য। তবে মোটামুটিভাবে সুখকর একটি সফর বলা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান


#mizanurrmizan

সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, এবিসি
প্রকাশিত : ১৫ নভেম্বর ২০১৭, দৈনিক জনকণ্ঠ
Previous Post Next Post