উড়োজাহাজ ছাড়া বিশ্বজয়ের গল্প

জেদ্দায় গ্রাহাম ডেভিড হিউজ
By Graham Hughes - Own workCC BY-SA 3.0Link
দ্য ওডিসি এক্সপেডিশন। একটি অভিযানের নাম। সাধারণ কোনো অভিযান নয় এটি, সম্পূর্ণ ব্যক্তিক একটি বিশেষ ইস্যু। যিনি এ অভিযান চালিয়েছেন তিনি চলচ্চিত্রকার বা ভিডিও মেকার বলে পরিচিত। একজন চলচ্চিত্রকারের ধ্যান-জ্ঞান হয়ে থাকে চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করেই। সমাজ, দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মে অন্যকে উত্সাহ দিতে পারেন, রেকর্ড গড়তে, ভাঙতেও পারেন, কিন্তু তা শুধু চলচ্চিত্রে নিজের কারিশম্যাটিক কাজ দিয়ে। আবার পেশা একটা থাকলেও নেশা দ্বারা যে বিখ্যাত হওয়া বা বিশেষ কোনো রেকর্ডও
গড়া যায় সেটির অন্যতম একটি উদাহরণ পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্রকার গ্রাহাম হিউজ। চলচ্চিত্রই যার চিন্তার প্রধান ক্ষেত্র হওয়া উচিত ছিল সে কি-না হঠাত্ করেই ভিন্ন স্বাধের ভাবনার পাল্লায় পড়ে গেল। সেটা যেন-তেন কিছু নয়, পুরোবিশ্ব ভ্রমণেচ্ছু প্রয়াশ। তা-ও আবার আকাশপথকে বাদ রেখে। স্থির করলেন কোনোরকম আকাশযান ব্যতিরেকেই বিশ্বের সবক’টি দেশ ভ্রমণ করবেন, করেও দেখালেন তা। এ পর্যন্ত ২২০টি দেশ ও বিশেষ অঞ্চল ভ্রমণ করে ফেলেছেন। ভ্রমণ পর্ব একাই সেরেছেন। না ছিল কোনো বিশেষ সঙ্গী, না নিয়েছেন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা। পরিবার ও খুব কাছের বন্ধু-বান্ধবরাই তার অ্যাডভেঞ্চারে আর্থিক সহযোগিতা করেছে।

প্রত্যেক সপ্তাহের জন্য বাজেট ছিল ১৫০ ইউএস ডলার। গ্রাহাম হিউজ (Graham Hughes) যাত্রা শুরু করেন ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি আর্জন্টিনা থেকে উরুগুয়ের উদ্দেশ্যে পথে নেমে। শুরুতে যানবাহন হিসেবে ব্যবহার করেন নৌকা। বলা হয়ে থাকে এটিই কোনোরকম সঙ্গীবিহীন সবচেয়ে আনন্দদায়ক অ্যাডভেঞ্চার। অনেকেই বলতো যে, এটা সম্ভব নয়, বিপদ হবে এতে। কিন্তু এসব ভুল প্রমাণ করে জায়গা করে নিয়েছেন গিনেজ বুকে। আসলে তিনি জীবন ঝুঁকি নিয়ে প্রমাণের জন্য কাজ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এই অ্যাডভেঞ্চারার মনে করেন, এ রকম একটি ভ্রমণের জন্য কেউই আগে প্রলুব্ধ হয়নি।
জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর ১৯২টি দেশই সফর করে ফেলেছেন যতক্ষণে, ততোক্ষণে নবজন্মা সাউথ সুদানে পা রাখার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। সেখানে পা রাখা ছাড়া তো আর জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত দেশ ভ্রমণে পূর্ণতা পায় না। অবশেষে পা ফেলা সম্ভব হয়। মজার বিষয় হলো, এক্সপেডিশন নিয়ে যখন মাঠে নেমেছিলেন তখনও সাউথ সুদানের জন্ম হয়নি। মাত্র ৪ বছরের ব্যবধানে আকাশপথ ছাড়াই জাতিসংঘের সদস্যদেশসহ মোট ২০১টি দেশ ও বিশেষ স্বীকৃত অঞ্চল ভ্রমণ সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২০-এ। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত দেশ ছাড়া তিনি যেসব অঞ্চল বা বিভিন্ন দেশের বিশেষ অঞ্চলে গেছেন তা হলো—ভ্যাটিকান সিটি, ফিলিস্তিনের আংশিক স্বীকৃত রাষ্ট্রাঞ্চল, পশ্চিম সাহারা, কসোভো, তাইওয়ানসহ আরও বেশকিছু। পশ্চিম আফ্রিকার কেপ ভার্দ দ্বীপ থেকে হিউজকে স্মাগলার সন্দেহে জেলে পাঠানো হয়, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পত্রিকাসমূহে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। লিমা প্রিজনে বেশ কিছুদিন থাকেন।

তার এই ‘দ্য ওডিসি এক্সপেডিশন’-এর শর্ত কিংবা নিয়ম ছিল বিশ্বের দেশগুলোতে তিনি ভ্রমণ করবেন কোনোরকম আকাশপথ ছাড়াই এবং কোনো দেশের দূরবর্তী কোনো অঞ্চল বা বিশেষ কোনো অঞ্চলে গিয়ে দেশটি ভ্রমণ করা হয়েছে বলে ধরা যাবে না। এতে করেই তিনি গিনেজ বুকে রেকর্ড করে নেন। তবু গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃপক্ষের একটি আপত্তি ছিল এই অভিযানটির ওপর, তিনি রাশিয়াতে গিয়েছেন কি-না সে প্রসঙ্গে। মূলত তিনি রাশিয়াতে গেছেন বটে, তবে স্বীকৃত কোনো সীমান্ত ধরে প্রবেশ করেননি। এটিই একমাত্র দেশ যেটিতে গ্রাহাম হিউজ সশরীরে প্রবেশ করতে পারলেও কাগজ তা সমর্থন করে না, যেহেতু স্বীকৃত কোনো প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করেননি। এমনকি সেদেশের সীমান্তেও আটক হন এবং তাকে রাশিয়া থেকে ফেরত যেতে বাধ্য করা হয়। ফেরার সময় সাহারা মরুভূমি হয়ে ফেরেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে নতুন করে ভিসা নিয়ে পুনরায় রাশিয়ায় প্রবেশ করেন।

গ্রাহাম হিউজ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন ভারতের পশ্চিম বাংলার চ্যাংড়াবান্দা হয়ে। তিনি ব্লগে লেখেন এখানে বড় কোনো বেড়া ছিল না। দু-দেশের সীমান্ত মধ্যবর্তী পথ মাত্র ৩ মিটার। এখানে একটি পতাকা দেখতে পান এবং ‘Welcome to Bangladesh’ লেখা একটি চিহ্ন বিশেষ। ভারত এবং বাংলাদেশের সীমান্ত প্রহরীদের সহায়তায় সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢোকেন এবং মিনিট পাঁচেক হেঁটে ভেতরের দিকে যান এবং কয়েকটি লাফ-ঝাঁপ দেন। সীমান্তে দায়িত্বরত কর্মকর্তার কাছে ছবি তোলার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দেননি। ভারতের সীমান্ত এলাকাটি তার কাছে তেমন ভালো লাগেনি এবং রাস্তাঘাটও ভাঙা বলে জানিয়েছেন ব্লগে। বাংলাদেশ থেকে ফিরে তিনি নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে ভুটানের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। আর এভাবেই তার ভ্রমণ চলছিল। কখনও বেশ ফুরফুরে মেজাজে, কখনও কিছুটা ভয়ার্ত মনে। এক্সপেডিশনে ফুটবল বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের হার দেখেছেন, শ্রীলঙ্কায় ক্রিকেট ম্যাচ দেখেছেন, অংশ নিয়েছেন বিশ্বের নানা উত্সবেও।

মি. হিউজ ১ বছরের মধ্যেই ১৩৩ দেশে টেক্সি, বাস, ট্রেন, লরিসহ বিভিন্ন স্থল পরিবহণে ভ্রমণ কর্ম সম্পূর্ণ করেছিলেন। এটিও একটি গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। স্বীকৃতিটি গ্রাহাম হিউজ অভিযানের বছরের প্রথম বছরেই পেয়ে যান এবং ২০১৪ সালে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেন যে, হিউজের ভ্রমণটি ছিল বিশ্বের সবক’টি দেশে গণপরিবহণে করে আকাশপথ ছাড়াই সবচেয়ে কম সময়ের সফল ভ্রমণ। রেকর্ডটি যাচাইয়ে গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃপক্ষও ব্যয় করেছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ের রেকর্ডসমূহের সত্যতা যাচাইয়ে এতটা সময় লাগে না, যেটি স্বীকার করে নিয়েছেন গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড সংস্থাটির প্রধান মার্কো ফ্রিগেটি।

এই অ্যাডভেঞ্চারে নিয়ে বানানো একটি ভিডিও ‘ওয়ান সেকেন্ড এভরি কান্ট্রি’ তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং কয়েক সেকেণ্ডের ভেতরেই ১০ লক্ষ বারের ওপরে দেখা হয়েছিল ইউটিউবে, এখনও দেখা হচ্ছে। ভ্রমণের পর তিনি বলেন, কোনো দেশের মানুষকেই সরকারের কর্ম দ্বারা মাপা ঠিক নয়। চলচ্চিত্রসহ তিনি সঙ্গীতশিল্পী ও প্রতিষ্ঠানের সাথেও দক্ষতার সাথে কাজ করেন। গ্রাহাম ডেভিড হিউজের জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের লিভারপুল শহরে। বর্তমানে তিনি তার অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে সিরিজ বই লেখায় ব্যস্ত আছেন। কিছুসংখ্যক বই অনলাইনেও পাওয়া যাচ্ছে।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info

#mizanurrmizan

তথ্যসূত্র:ওডিসি এক্সপেডিশন ওয়েবসাইট ও ডেইলি মেইল

(অক্টোবর ২৮, ২০১৭ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ভিন্ন চোখে ফিচার পাতায় প্রকাশিত, শিরোনাম ছিল ভিন্ন এক অভিযানের গল্প)
ভিন্ন চোখে ফিচার পাতা, দৈনিক ইত্তেফাক

ভিন্ন চোখে ফিচার পাতা, দৈনিক ইত্তেফাক

Previous Post Next Post