কাঠমিস্ত্রি যখন বইয়ের ফেরিওয়ালা!

পেশায় কাঠমিস্ত্রী, পড়াশোনার সুযোগ হয়েছে মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। স্ত্রী, ৫ বছরের এক মেয়ে, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এক ভাই ও মা’সহ ৫ জনের পরিবারে তিনি একাই উপার্জন করেন, নাম তার মো. জসিমউদ্দিন। বাবা ছোটবেলায়ই তাদের ফেলে কোথায় যেন চলে গেছেন। বলার মতো নিজের অর্থ-সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই, আছে একটা প্রশস্ত মন। যে মন মানুষকে আলোকিত করার স্বপ্ন দেখে। ২০১৬ সালের
২৯ অক্টোবর তিনি নিজ উদ্যোগে একটি পাঠাগার স্থাপন করেছেন ‘কমিউনিটি লাইব্রেরি’ নামে। এটি ২৯ অক্টোবর দ্বিতীয় বছরে পা রাখতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত তার বইয়ের সংগ্রহ প্রায় ৫০০-এর এবং সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১২ জনে। তিনি বই কেনেন নিজের খরচে, সদস্য সংগ্রহও করেন বিনা পয়সায়। এখানের সদস্যদের তিনি নানারকম বই পড়তেও দেন বিনামূল্যে। তার বিশ্বাস, গ্রামের কম শিক্ষিত মানুষগুলো বইপড়ার মাধ্যমে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবেন, ইচ্ছে থাকলে ভালো কিছু করা সম্ভব। এ পাঠাগারে যারা পড়তে আসেন বা বই ধার নেন তারা কেউই একটি মাত্র শ্রেণির নন। কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সকলেই। তার ভাষায়, ‘শুধুমাত্র স্কুলের ছেলেমেয়েরা নয়, যারা অনার্সে পড়ে তারাও আমার লাইব্রেরি থেকে বই নেয়। এমনকি বয়স্ক ও যেসব মেয়ের কিছুদিন হলো বিয়ে হয়েছে তারা সবাই আসে, বই নেয়। আমার মতো খেটে খাওয়া মানুষরাও আসেন।’


লাইব্রেরি সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও তিনি মূলত অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত মানুষদের বই পড়ানোর চিন্তা থেকেই এই পাঠাগারটি স্থাপন করেছেন। তাকে জিজ্ঞেস করি, আপনি তো একজন কাঠমিস্ত্রী, আয় স্বাভাবিকভাবেই কম, এরপর মাথার ওপর আপনার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছোট ভাই, কেমন করে সাহস হলো আপনার এই উদ্যোগ নিতে? তিনি বলেন, ‘আসলে কেমন করে উদ্যোগটা নিয়ে ফেলি সেটা সেটা আমি নিজেও জানি না। তবে ছোটবেলায় আমার পড়ার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল, কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার কারণে আর তা হয়নি। সংসারের ভার নিতে হয়। আমি মাঝে মাঝে বই সংগ্রহ করে পড়তাম, অন্যকে পড়তে দিতাম। ধীরে ধীরে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং এক সময় এ রকম একটা লাইব্রেরি গড়ার সিদ্ধান্ত নেই। শুরুতে আমার আগের পড়া কিছু বই আর কিছু কিনে প্রায় ১০০-র মতো বই নিয়ে আমার এ লাইব্রেরি শুরু করি।’


দেশে প্রতিবন্ধী ভাতা চালু থাকলেও তার ছোট ভাইয়ের নাম সেই খাতায় নেই। কোনো এক প্রতিনিধি তাকে বলেছিল যে, তার ভাইয়ের নামটি দিয়ে দেবে। কিন্তু সাথে একটি আপত্তিকর প্রস্তাব ছিল। যে প্রস্তাব অনৈতিক বলে গ্রহণ করেননি তিনি।


পাঠাগারটিতে মাসিক খরচ সম্পর্কে তিনি জানান, ঘর ভাড়া ২০০, বিদ্যুত্ বিল ১০০ এবং একটি জাতীয় দৈনিক রাখেন, যার জন্য তাকে আরও ৩০০ টাকা খরচ করতে হয়। এছাড়াও পত্রিকার বিভিন্ন নিবন্ধ ফটোকপি করাসহ আরও কিছু টাকা খরচ করতে হয়, যা হিসেবের বাইরে থাকে। কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা পাননি। তবে একটি সহযোগিতার কথা তিনি বলেন, তা হলো লাইব্রেরিতে মানুষের আসা-যাওয়া। কেউ তাকে তেমনভাবে সাহায্য না করলেও তার কর্ম নিয়ে অনেকেই ঠাট্টা বিদ্রুপ করেন। অনেকেই তাকে পাগল বলেন। নিজেই যেখানে দিন এনে দিন খেতে পারে না সেখানে তিনি মানুষকে বই পড়ান। আর এ নিয়েই বিদ্রুপ। শুধু কি মহল্লার লোকজন? না, তার পরিবারও চায় তিনি যেন আর বই না কেনেন, অভাবের সংসার। তবে স্ত্রী কিংবা মা, কেউই তা মুখে বলেননি, তবে বুঝতে পারেন জসিমউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আসলে এটাই বাস্তব যে, কেউই চায় না টানের সংসারে অর্থ অতিরিক্ত কোনো খাতে খরচ হোক। তেমনই আমার পরিবারও চায় না, কিন্তু আমি বুঝি। আর আত্মীয়স্বজনও আশেপাশে থাকা মানুষদের মতোই কেউ ভালো বলেন, কেউ খারাপ বলেন।’


তিনি মনে করেন করেন, লোকের কথা লোকে বলবেই। অনেক সময় আপত্তিকর কথা বলবে, আবার প্রশংসা করবে। কোনো এনজিও থেকে সাহায্য পেয়েছেন কি-না? এমন প্রশ্নে তিনি জানান, সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহযোগিতা তিনি পাননি, তবে একজনের পরামর্শে স্থানীয় ইউএনও বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু তার উত্তরও পাননি। তবে যেকোনোরকমের সাহায্য তিনি গ্রহণ করবেন তার পাঠাগারের উন্নতির স্বার্থে। পত্রিকায় কলাম লেখেন এমন কয়েকজনের ই-মেইল ঠিকানা পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করে বই চেয়েছেন। হাতে গোনা দু-তিনজন দিয়েছেনও কিছু বই। এরমধ্যে মুহাম্মদ জাফর ইকবালও রয়েছেন বলে জসিমউদ্দিন জানান। কিন্তু প্রথম তিনি যার নজরে আসেন তিনি হলেন মাছুম বিল্লাহ নামের একজন বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা ও কলামিস্ট। অবশ্য তার কাছেও এই বই পাগল ই-মেইল করেছিলেন।


দেশের মানুষের কাছে তার একটাই আকুতি, বিশেষ করে লেখক ও প্রকাশকদের কাছে, তাকে যেন কিছু বই দিয়ে সাহায্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখন বইয়ের ভিক্ষুক, মানুষ যেন আমাকে বই ভিক্ষা দেন।’ জসিমউদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আজকালের মানুষগুলো শুধু সার্টিফিকেটের জন্য বই পড়ে, কি হবে এসএসসি পাশ, এইচএসসি পাশ করে, যদি সঠিক জ্ঞানই না থাকলো?’ অভিভাবকরা মনে করেন, বাচ্চারা শুধু পাঠ্যবই পড়লেই যথেষ্ট, কিন্তু তা নয়। তিনি স্বপ্ন দেখেন, তার পাঠাগারে হরেকরকমের ভালো ভালো বই থাকবে, মানুষ বইপড়ার জন্য পাঠাগারে ভিড় জমাবে।


কুষ্টিয়া জেলাধীন খোকসা থানার পাইকপাড়া গ্রামের ৩২ বছর বয়সী এ ব্যতিক্রমী মানুষটির সাথে কথা বলে বোঝার উপায় নেই যে, তিনি মাত্র দুই ক্লাস পড়েছেন। তিনি মানুষকে সত্যিকারের আলোকিত মানুষ হিসেবে দেখতে চান। খুব ভালোলাগার বিষয় হলো, দেশের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা যেসব কথা বলবেন সেকথা বলেন প্রাতিষ্ঠানিক হিসেবে এই অল্প শিক্ষিত মানুষটি।


মানুষ আজ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বিভিন্ন রকম চরিত্র চরিতার্থ করছে। অর্থ লোভে মত্ত, প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ছে, সেরা বিদ্যাপীঠগুলোতে রক্তখেলা, ভদ্র পোশাকি মানুষগুলোর হাতে পিস্তল-রামদা-হকস্টিক, মুখে মুখে আপত্তিকর অকথ্য বাক্যমালাসহ নানারকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে জাতি। অধিকাংশ সামর্থ্যবান মানুষের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কেবল অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা ও যশ-প্রতিপত্তি, অথচ জসিমউদ্দিন নিজে দিনমজুর হয়েও নিজ উদ্যোগ ও নিজ খরচে বই কিনছেন, মানুষকে পড়তে দিচ্ছেন। আমরা কি বুঝতে পারছি তিনি কত বড় মহত্ একটি কাজ করে চলছেন? দেশের শিক্ষাবিদ কিংবা বিত্তশালীরা ব্যক্তি উদ্যোগ ও খরচে এমন একটি কর্মের কথা স্বপ্নেও বোধহয় ভাবেন না। শুভকামনা রইল জসিমউদ্দিনের প্রতি।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info
#mizanurrmizan
Previous Post Next Post