কুমিল্লার কোলে একদিন

ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৭।

কথা ছিল আমি যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার থেকে উঠব,ওরা গাড়ি ছাড়বে সাড়ে ছয়টায়। কথামত নিজেকে প্রস্তত করে চৌরাস্তা সিড়ি বেয়ে উপরে উঠি,ফোন দেই,আপডেট জানতে থাকি। মিনিট দশেকের ব্যবধানে আমার সাথে যোগ দেয় রাফি আর তৌহিদ। আগে শনিরআখড়া থেকে উঠবে বলে জানিয়েছিল,কে জানে কেন চৌরাস্তায় যোগ দিল পাঁচ-পাঁচ দশটাকা খরচ করে?

ডিউ টাইমে ক্যাম্পাস ছাড়ার সৌভাগ্য ওদের হয়নি যদিও এ ব্যাপারে বন্ধুরা বড় গলায় দৃঢ় ছিল, আমিও কম করে হলেও আধাঘণ্টা যাবত্‍ বিভিন্ন গাড়ির নাম মুখস্থ করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে ছিলাম। পরিকল্পণা ছিল অনেক দিনের। একবার মোহসিনা ম্যাম পরিকল্পণা করে কেনই যেন আমাদের নিয়ে পেরে উঠতে পারেননি তবে এবার বাস্তব রুপখানা দিয়েই ফেলেন মুমু ম্যাম। কখন, কিভাবে, কোথায়, কী কী করতে হবে সবই আমাদের এই প্রিয় ম্যামের পরিকল্পনা মত হয়েছে। কিছুটা দূর থেকেই খেয়াল করলাম ক্যাম্পাসের একটি গাড়ি, তাত্‍ক্ষণিকভাবে একটু কৌতুহলী হয়ে যাই।
শালবন বিহারে রঞ্জিত স্যার ও রিয়াদ স্যারের সাথে আমাদের একাংশ
থার্ড রো’র ফার্স্ট সিটটিতে বসি আমি, পাশের সিট দুটোর নিয়মিত দখলদার নেই। বসার পরে খেয়াল করলাম আমার ঠিক সামনের দু'পাশে বসা আমার প্রিয় শিক্ষকরা। তাঁরা তিন জন- রঞ্জিত স্যার, রিয়াদ স্যার আর আমার নেমসেক মিজান স্যার। আমাদের সকলের সাথেই রয়েছে তাঁদের বধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যদিও বয়সের পাল্লায় তাদেরটা আমাদের থেকে তিনগুন। সামনে ফ্লাইওভারের টোল বক্স কিন্তু টোল আমরা দেবনা। সিগন্যাল পড়ল, বাস দাঁড়াল, কয়েকজন নেমে পড়ল একটা কাগজ নিয়ে, যে কাগজ আমাদের ভ্রমনের অফিসিয়াল দলিল। কিছুক্ষন কথাবার্তার পর একটি লিখিত দেয়ার বিপরিতে আমাদের ছেড়ে দেয়া হয়। ধন্যবাদ দিলাম দায়িত্বরত টোল আদায়কারিকে, তিনিও হাত নেড়ে জবাব দিলেন। মেঘনা ব্রিজেও ঠিক আগের ঘটনাটিরই নকল।

শনিরআখড়া পেছনে ফেলতেই মিজান স্যার মাইক্রোফোনটি নিয়ে নির্দেশনা বা যেখানে যাচ্ছি সেখানটার কিছু বর্ণনা দিলেন যদিও এসবের প্রায় তথ্যেই সকলে অবগত, তবে ফরমালিটি বলে কথা। শেষে জানালেন, তার বাড়ি কুমিল্লাতেই। এটা শুনতে না শুনতেই পুরো বাস উল্লাশে ফাটে।

নারায়ণগঞ্জ এরিয়াতে ঢোকার পূর্বেই সকালের নাস্তা বিলি হয়ে যায়। কলা, পাউরুটি, জেলি, সিদ্ধ ডিম আর একটা ২৫০ মিলি পানির বোতল। নাস্তাটা ভালই ছিল কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার কলাটি ছিল আধা পচা। অবশ্য রাজু কাজী ওরটা আমার সাথে শেয়ার করতে চাইল। ছোট বেলায় শুনেছিলাম, বীচি কলার ছোলা কাঁচা আর কাঁঠালি কলার ছোলা পচা। কিন্তু এই সুত্র এখানে কাজে লাগেনি যেহেতু এটা ছিল শবরী। গাড়ি চলছে ড্রাইভার মামার ইচ্ছেমত, মামা কি ওভারটেকিং খেলায় মেতে উঠেছিল নাকি অন্যগুলোর স্পিড আমাদের গাড়ির তুলনায় কম ছিল? বুঝতে পারিনি কিন্তু চলছিল রেলের গতিতে। কাঁচপুর পেরুলেই কয়েকজন বাদে বাকিরা ড্যান্সে পাগলু হয়, গোমতী ব্রিজ পার হওয়ার কয়েক মিনিট আগে হঠাত গাড়িটিকে রাস্তার পাশে রাখেন, অবাক চোখে এপাশ ওপাশ তাকালাম, মুশকিলটা কী? দেখছি রঞ্জিত স্যার হাতে মাইক্রোফোন তুলে নিলেন। একজন বলল- সবাই থাম, স্যার কিছু বলবেন। স্যার শান্ত গলায় বললেন, আনন্দ কর কিন্তু সিট ছেড়ে লাফালাফি করনা, গাড়িটা খুবই হালকা, সারা গায়ে শুধু প্লাস্টিক, ড্রাইভারের সমস্যা হচ্ছে। সবাই তাঁর কথাকে সম্মান জানালাম।
শুরু হতেই সবথেকে ইনোসেন্ট ও ফ্রেশ লুকের অধিকারী বাবন একেক সময় একেক কৌতুক নিয়ে সবাইকে একটু বিনোদিত করার চেষ্টা করল। বেলুন ফাটিয়ে নিয়ে, বোতল নিয়ে, চকলেট নিয়ে আবার কখনও ব্যবহৃত মোবাইল স্ক্রাচ কার্ড নিয়ে। ওইতো, সাথে রাখা ব্যাগ থেকে কতগুলো ব্যবহৃত স্ক্রাচ কার্ড বের করে লেকচার শুরু করল, “প্রিয় যাত্রী ভাই ও বোনেরা, অপরিচিতদের দেয়া কিছু খাবেন না, মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। আপনারা আসা যাওয়ার মাঝে আমার কাছে পাচ্ছেন খুব উপকারী একটি জিনিস, মোবাইলে ব্যলেন্স শেষ? কিনে নিতে পারেন আমার এই কার্ড, ডাটা নেই? তাও পাবেন একই কার্ডে, মেয়াদ আজীবন। শুধু একটি রেস্ত্রিকশন, কেনার আগে হাতে নিয়ে দেখতে পারবেন না, বুঝতেই পারছেন খুব দামী জিনিস, যেকোনো অপারেটরে ব্যবহার করা যাবে। দাম খুব বেশিনা, দোকানে গেলে তাঁরা একদাম ১০ টাকা নিবে তবে আমি তা নিচ্ছিনা। কোম্পানির প্রচারের জন্য মাত্র ৫ টাকা।”
দেখতে দেখতে মেঘনা ব্রিজও পার হয়ে এলাম, মেঘনা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি নদী। নদীটির প্রশস্ততা ও দুপাশের সড়কের বিচারে ব্রিজটা একেবারেই সরু। দুর্ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে কিন্তু ঘটেনা, এটা খোদার দয়া। গাড়ি চলছেই, নাচানাচিও চলে। কথায় আছেনা, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। ওদের কাছে এটা মজা, মাস্তি আর আমাদের কাছে বিপদের কারণ। অবশ্য বিজয়টা ওদেরই হয়েছে আর আমরা বলি- সাবধানের মার নেই।

আনুমানিক ৩ ঘণ্টা পর ময়নামতি (কমনওয়েলথ) ওয়ার সিমেট্রিতে পা রাখলাম, গুরুরা বললেন- কোন রকম হৈ হুল্লোড় এখানে করা যাবেনা। মিজান স্যার ছোট একটা কাজ দিলেন, খুজে বের করতে হবে এখানে সমাধিস্থ সবচে কম বয়সি যোদ্ধার নাম, ঠিকানা এবং সমাধিটি। ব্যর্থ হলাম, অন্য কেউ পেরেছে কিনা বা চেষ্টা করেছে কিনা জানিনা। সবাই যে যার মত পোজ দিয়ে ছবি ওঠাতে ব্যস্ত, আমি বললাম- “এই, তোমরা এসেছ সমাধিস্থলে, মনে থাকবে শ্রদ্ধা, সমবেদনা, একটু ভয়। আর সবাই খিটখিট করছো?” মাসুদ, নজরুল আর আমি সেমট্রি স্থলটির চুড়ায় উঠে কয়েকটা সেলফি নেই। গাছগাছালির অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য ঘিরে রেখেছে এটি। ফুলের সৌরভ, গাছের পাতায় বাতাস আর রোদের খেলা নিয়ে অসাধারন একটুকরো জমি। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে নিহত ৭৩৭ জন সৈনিক, পূর্বে আরও একজন ছিলেন কিন্তু ১৯৬২ সালে আত্মীয় স্বজনরা এসে তাঁর সমাধি স্বদেশ যুক্তরাজ্যে নিয়ে যান। এর মধ্যে ২৪ জন জাপানি যুদ্ধবন্দি এবং ১ জন বেসামরিক ব্যক্তি রয়েছেন, ১৪ জনের সঠিক ঠিকানা পাওয়া যায়নি। আহত হয়ে পরে মারা যাওয়া সাধারণ সৈনিক থেকে ব্রিগেডিয়ার পদ মর্যাদাধারীকে এখানে সমাহিত করা হয়েছে। কুমিল্লা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কিনারায়। এতে রয়েছে ব্রিটেনের ৩৫০ জন, কানাডার ১২ জন, অস্ট্রেলিয়ার ১২ জন, নিউজিল্যান্ডের ৪ জন, দক্ষিণ আফ্রিকার ১ জন, অবিভক্ত ভারতের ১৭২ জন, পূর্ব আফ্রিকার ৫৬ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬ জন, বার্মার ১ জন, দক্ষিণ রোডেশিয়ার ৩ জন, বেলজিয়ামের ১ জন, পোল্যান্ডের ১ জন এবং জাপানের ২৪ জন যুদ্ধবন্দির সমাধি। যাদের সমাহিত করা হয়েছে তাদের লাশ আনা হয়েছে ঢাকা, ফরিদপুর, সৈয়দপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে। স্থলটি নির্মাণ করেন আর্মি গ্যারিসন ইঞ্জিনিয়াররা। এ দেশে কমনওয়েলথের আরও একটি সিমেট্রি রয়েছে, সেটি চিটাগংয়ে, ৭৫৫ জনকে সমাহিত করা হয় বাদশা মিয়া রোডের এই সমাধিস্থলে।
মাসুদের সেলফিতে নজরুল আর আমি
হাইওয়ে ছেড়ে আমাদের চারটি চাকা ঘুরেঘুরে পৌছালো কুমিল্লা টিটিসি ক্যাম্পাসে। আমাদের রেস্ট হাউস হিসেবে এটাকেই বেছে নেয়া হয়েছে, সপ্তাহখানেক আগেই চূড়ান্ত হয় সব। বেশ ছিমছাম গাছে ঢাকা পরিবেশ, পাখির কলরবে মুখরিত দারুণ একটি আবহ। শুধু আমার নয়, আমাদের সবারই খুব দারুণ লেগেছে। রঞ্জিত স্যারকে মজা করে বলি, “স্যার ঢাকা টিটসি থেকে এখানে ট্রান্সফার হব নাকি? কি সুন্দর! দেখেছেন স্যার এখানের ভবনগুলো কি দারুণ?” স্যার বললেন, “সব ঠিক আছে, ভাল লাগলে চলে আসো। কিন্তু বলত, নানির চেহারা তোমার কাছে ভাল লাগবে নাকি নাতনির চেহারা?” বুঝতে বাকি নেই যে, স্যার কি বলতে চাচ্ছেন। আসলে ঢাকা টিটিসি ১০০ পেরিয়েছে আরও আগে, এটা মাত্র ৫০এর কোঠায়। ১৯০৯ থেকে ১৯৬২, বেশ তফাৎ। সবাই ফ্রেশ হয়ে শালবন বিহার কেটে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। ছোট্ট পাহাড়ের ওপর ‘For better Education’ মোটো নিয়ে ২০০৬ সাল থেকে দাড়িয়ে আছে এটি। আমার একটা বন্ধুকে জানিয়ে রেখেছিলাম আমাদের যাওয়ার কথা, দেখাও হল, খুবই ভাল লেগেছে। ওর নাম হানিফ, চেহারায় কেমন যেন বয়স্ক একটা ভাব চলে এসেছে, এদিক থেকে নিজেকে আমি ভাগ্যবান ভাবতে পারি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে শালবন বিহারে ঢুকলাম যার পূর্বনাম নাম রাজার বাড়ি। এখানেও ওই আগের মতই সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সবার কাছেই দামী সেলফোন সেট শুধু আমার কাছে নেই। ইফতেখার ওর ডিএসএলআর নিয়ে এসেছে তাই আজ ওর বেশ কদর। যারযার মোবাইল থেকে সে সে ছবি তুলছে, আমারটাও কেউ তুলে দিচ্ছে নামে মাত্র অনুরোধের পর। আমাদের সঙ্গে যাওয়া রিয়াদ স্যারের ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে ইফরান শুরুতেই বিহারের কক্ষ গণনার কাজে লেগে গেল, ১১৫টি হবে কিনা সেটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য। প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে ধরা দেয়, খননের পর ১১৫টি ভিক্ষুকক্ষ বিশিষ্ট ৫৫০' × ৫৫০'পরিমাপের একটি বৌদ্ধ বিহারের একটি নকশা। এ থেকেই এর নাম শালবন বিহার। বিহারটির মধ্যভাগে একটি মন্দির ও উত্তর মাঝামাঝি স্থানে প্রবেশ তোরণ এর বিশেষ আকর্ষণ। বিহারটিতে ৪টি ও কেন্দ্রিয় মন্দিরে ৬ টি নির্মাণ যুগের প্রমান পাওয়া যায়। খননে প্রাপ্ত একটি পোড়ামাটির মুদ্রক থেকে জানা যায়, এই বিহারটি দেব বংশের ৪র্থ রাজা শ্রী ভবদেব খৃস্টীয় আট শতকে নির্মাণ করেছেন। তাই এর আসল নাম হিসেবে ‘ভবদেব মহাবিহার’ বলে অনেকে মত দিয়েছেন।

উত্তর দিকের একটি কক্ষের পাশে গিয়ে আমরা বসি। রঞ্জিত স্যার ছিলেন মাঝখানে, তাঁর ডান পাশে রিয়াদ স্যার, আশেপাশে সবাই। কিচ্ছা হচ্ছে, গান হচ্ছে। সাইফুল গাইল সর্বনাশা পদ্মা নদী, আবির গাইল কফি হাউস, আতিক গাইল আমার মন মজাইয়ারে... । আতিকেরটা বোধ হয় বেশি ভাল হয়েছিল যদিও সবারটাই অসাধারণ ছিল। গানের সাথে সাথে রঞ্জিত স্যার বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। আমিও গানের সুরে শিষ বাজাচ্ছিলাম, এটা মোটামুটি ভালই পারি তবে বাঁশিটা একদমই পারিনা। ফুঁক দেয়ার আগেই দম ফুঁড়িয়ে যায়। সুযোগ পেলে সবাই ক্যামেরায় ক্লিক আর ট্যাপ মারছে।

আমাদের রেস্ট হাউসে ফিরে আসলাম, পুনরায় ফ্রেশ হলাম, লাঞ্চ করলাম, যে যার মত বিশ্রাম নিলাম। কেউ গাছতলায়, কেউ হলের ভেতরে, কেউ আবার আম্ব্রেলা স্ট্যান্ডে, কেউ দোলনায় দোল খাচ্ছিল।

ঘড়ির কাঁটা ৪ টার কাছাকাছি কিন্তু এর অনেক আগেই আমাদের ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড)’ এরিয়াতে প্রবেশের কথা ছিল। ড. আখতার হামিদ খানের উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বার্ড বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীনস্থ একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। স্যারদেরও কোন খবর নেই, হয়ত পুরনো বন্ধুদের সাথে মজেছেন। বুদ্ধি করে রিয়াদ স্যারকে রিং দিলাম। কল ধরতেই বলি, “স্যার সময়তো প্রায় শেষ, কাউকেতো দেখছিনা, কে কোথায় যে গেছে?” স্যারকে আর এটা বলিনি যে, আমরা আপনাদের জন্যই বসে আছি। তিনি বললেন সবাইকে নিয়ে বার্ডের ফটকে দাড়াতে। খানিক বাদে সবাই ঢুকলাম। সাথে কুমিল্লা টিটিসির একজন শিক্ষক, তিনি ফরিদ স্যার।
এখানে সোজা ডানের রাস্তা ধরে কিছুক্ষণ হেঁটে আবার ডানে মোড় নিয়ে ‘নীলাচলে’র উপরে উঠারর জন্য পা বাড়াই। মাঝখানে ছোট্ট একটা সিঁড়ির মত। ফরিদ স্যার বললেন, এই ধাপগুলো গুনেগুনে উঠ সবাই, পরে ধরব। আমার হিসেবে ৪২টি, নজরুল বলে ৪৩টি, তিনি বলেন একটিও ঠিক হয়নি। গাছে ঢাকা পরিবেশ, ভরদুপুরেও গোধূলির আমেজ থাকে নিশ্চয়ই। পিচঢালা পথ। শেষ পর্যন্ত উঠে পড়লাম চূড়ায়, উঠেই কংক্রিটের বেঞ্চিতে শুয়ে পড়ি। কিছুটা ক্লান্ত, সারাদিন হাঁটাহাঁটি, দুপুরের খাবারে পর ঘুমের সময় না পাওয়া- এর জন্যই কেবল; উচ্চতার জন্য নয়। মিনিট পাঁচেক পর উঠলাম স্যারের বাঁশির আওয়াজে, এটা নলের বাঁশি; সিগন্যাল দেয়া এর কাজ নয়। বিহারের মত এখানেও আমাদের আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করলেন। ছবি তোলার ধুম এখানেও। আফসোস, ক্যামেরা দূরে থাক আমার স্মার্ট ফোনও নেই।

ধীরেধীরে বার্ডের ভেতর দিয়ে আমরা বের হব বলে হাঁটা শুরু করি। মাঝখানে আমাদের সাথে থাকা ফরিদ স্যার শুধুমাত্র আমাকে ইশারা করে একটি বাংলো দেখিয়ে বলেন- বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এখানে। অজান্তেই মনের ভেতর বেজে উঠলো- “এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।”
রাজুর সেলফিতে বন্দী আমি
আর পেছনে সায়মা-নুপুরসহ অন্যরা
রেস্ট হাউস থেকে সবার কাছে বিদায় নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম। পথিমধ্যে র‍্যাফেল ড্র হল; কিছু পেলাম না। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীরা এতটা আন্তরিক ছিলেন কেন? শুধুমাত্র সৌজন্যতা বজায় রাখলেও সেটাই অনেক বড় হত। আমরা ঢাকা টিটিসি থেকে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। সন্ধ্যার পর রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে চা পানও করলাম।

কখনও যাদের নাচ দেখা হয়নি তাদেরটা দেখা হয়ে গেল। রিস্তা, নজরুল, নাজনিন, তানজিল, শিমু, মালেক, রাসেল, স্যারের ছেলে ইফরান সহ অনেকেই এই কাতারে। টিপু আর মোশাররফ শুরু থেকে যেমন কষ্ট করেছে, তেমন নাচ দেখালো।

সারাদিন রাসেল, আশিক কিংবা রাজু, এরা ক্যামেরা হাতেই ব্যস্ত ছিলো। কুমিল্লার এই সুন্দর পরিবেশে আমাদের নিশ্বাস ফেলে আসলেই খুব ভালো লেগেছিল। সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকায় সহপাঠীদের সাথে ওটিই ছিলো আমার প্রথম ও শেষ ভ্রমন।

- মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info
#mizanurrmizan
Previous Post Next Post