এইসম্যান: সফলতার আরেক নাম


হয়ত ছেলেটি বেশ খানিকটা জেদী স্বভাবের। বাবা তার বিখ্যাত ও বিত্তশালী একজন। যার জীবনী অনুসরণ করে আমেরিকান চলচ্চিত্রকার এ্যাডাম ম্যাককে ‘দ্য বিগ শর্ট’ নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন যাতে অভিনয় করেন ক্রিস্টিয়ান বেল, ইয়ার্ন গজলিং এবং ব্রাড পিটদের মতো তারকারা। এটি যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পায় ২০১৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। ১৩০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে তাকে মার্ক বম নামে পরিচতি করিয়ে দেয়া হয়।
১৬ বছরের এই কিশোর যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই ভিডিও গেম্সের প্রতি প্রচ আগ্রহ জন্মে। তবে তার আগ্রহের বিশেষত্ব গেম খেলা নয়, এ সম্পর্কিত খুঁটিনাটি বিষয়াদি জানার ও বোঝার। গেম যে খেলে না তা নয় কারণ আগ্রহটি তো ভিডিও গেম খেলা থেকেই সৃষ্ট। প্রোগ্রামিংয়েও কিছু ধারণা রয়েছে। গেম নিয়ে চিন্তা ভাবনার গভীরতা এতটাই ছিল যে, নিজেই একটি ভিডিও গেম বানিয়ে ফেলল।
নিজের প্রতি তৈরি হওয়া আত্মবিশ্বাস থেকেই সিদ্ধান্ত নেয় কোন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবীস হিসেবে কাজ করার। কিন্তু বিপত্তি আসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের আবেদন করার পর কোন প্রতিষ্ঠানই থাকে নিতে চায়নি। তারা বলে কিশোর বালকটির এক্ষেত্রে বেশকিছু দিকে অনভিজ্ঞতা রয়েছে। কাজের দ্বারে দ্বারে গিয়ে হতাশ হয়ে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল। তবে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয় আরও সাহসীকতার সঙ্গে অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজ নয় বরং নিজেই প্রতিষ্ঠান খুলবে।
সিদ্ধান্তটি বিত্তবান বাবাকে জানালে তিনি বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করলেন এবং ভবিষ্যতেও এ সম্পর্কে ছেলে চাইলে নানা পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু সাফ জানিয়ে দিলেন- ছেলের এই স্টার্টআপে তিনি কোন অর্থ ঢালতে পারবেন না, অর্থের উৎসটি কিশোর বালককেই খুঁজে নিতে হবে।
ছেলেও কম যায় না। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রয়োজন অনুসারে মুনাফা ভাগাভাগির শর্তে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান শুরুর জন্য কিছু কর্মী চেয়ে বিজ্ঞাপন দিল যা দেখে বেশিরভাগ লোকেরাই বালকটির কর্ম নিছক ‘বাতুলতা’ বলে উপহাস করতে থাকে। এরপরও বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৩০টি আবেদন জমা পরে। যা থেকে দেখে দেখে ১২ জন বাছাই করে নেয় এই কিশোর উদ্যোক্তা। ১২ জনের মধ্যে ২ জন প্রোগ্রামার, ১ জন আর্টিস্ট, ২ জন মিউজিক কম্পোজার এবং একটি মার্কেটিং টিম পছন্দ করে পোল্যান্ড থেকে। বাছাই করা প্রার্থীদের মধ্যে যার সবচেয়ে কম বয়স তার ১৮ বছর এবং যার সবচেয়ে বেশি তার বয়স ৩০ বছর। তারা যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান থেকে। এই কিশোর উদ্যোক্তার নাম তার ডেভিড এইসম্যান, বাবা স্টিভ এইসম্যান। স্টিভ এইসম্যানের সহায়তায় তাদের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হলে তাদের প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েই যাত্রা শুরু করে। ডেভিড এইসম্যান ব্যতীত চুক্তিবদ্ধদের কয়েকজন হলো- গর্ডন হেকম্যান, হান্টার ম্যাসন, ক্লেটন স্ট্রোআপ। প্রতিষ্ঠানটির নাম নির্বাচন করা হয়েছে পিক্সেল প্রোডাকশনস এবং এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) হিসেবে ডেভিড এইসম্যান দায়িত্ব নেয়।
আসলে কোন কিছুর প্রতিজ্ঞা করলে ঠিকই পারা যায় যদি পারিপার্শ্বিক অবস্থা প্রতিকূলেও থাকে। কোন কিছুর অভাবে হাল না ছেড়ে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুসারী নিজে নিজে পরিশ্রম করে একটি নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করে সামনে এগোলে তার ফলও বেশ সুমিষ্ট হয়। পাশাপাশি অভিজ্ঞতার ঝুড়িতেও জমা হয় নিত্যনতুন কিছু যা একজন মানুষকে সফলতার দুয়ার পর্যন্ত অনায়াসেই নিয়ে যেতে পারে। আর অন্যকে দিয়ে উদ্ধার হওয়া কাজে যেমন নিজের উপস্থিতি নগণ্য তেমন ওই কাজে তেমন আগ্রহও থাকে না। যেমন স্টিভ এইসম্যান যদি ছেলেকে কিছু অর্থকড়ি দিয়ে সহায়তা করতেন তাহলে ফলাফল উল্টো হলেও হতে পারত। না হলেও অন্তত পিক্সেল প্রোডাকশনকে শুরুতেই আন্তর্জাতিক রূপ দিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা থেকে বঞ্চিত হতে হতো। বাবা এতে সার্থক কারণ তার উদ্দেশ্যই ছিল ছেলে আত্মপ্রচেষ্টায়ই বড় হোক। ডেভিড এইসম্যানও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে নিজেকে অন্তত লক্ষ্যের প্রথম ধাপ পার করাতে পেরেছে এবং ভালভাবেই পেরেছে। যদিও সবাই এইসম্যান নয় তবুও এই সত্য গল্পটি থেকে আমরা আত্মনির্ভরশীল হতে একটু হলেও উৎসাহ খুঁজে নিতে পারি যা আমাদের ভবিষ্যত গোছাতে অনেকটা সাহায্য করবে।
স্টিভ এইসম্যানের পুত্র ডেভিড এইসম্যান ও তার প্রতিষ্ঠিত পিক্সেল প্রোডাকশন জানান দেয়- কারও মধ্যে ইতিবাচক জেদ থাকলে সে সুপরিকল্পিতভাবে এবং সঠিক পথে এগোলে তার জন্য সাফল্য নিশ্চিত।

মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info

মূল তথ্যসূত্র : বিজনেস ইনসাইডার এবং উইকিপিডিয়া
(প্রকাশিত : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, দৈনিক জনকণ্ঠ)
Previous Post Next Post