মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার বিকল্প নেই

আধুনিক বিশ্বে ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন’ বা ‘Human Resource Development’ বিষয়টি বিশেষভাবে প্রচলিত। গবেষকরা মনে করেন, সমাজ, দেশ ও বিশ্বের সামগ্রিক অগ্রগতিকে সচল রাখার জন্য কেবল মানবসম্পদই ভূমিকা রাখতে পারে। এই সম্পদকে অনেকে অনেকভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তবে মূল কথা হলো অর্থনৈতিকভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উত্পাদনসহ আনুষঙ্গিক কার্যাবলি এবং ইতিবাচক-কল্যাণকর বিষয়াদির সাথে জনসংখ্যার যে অংশটি সংক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে তা-ই মানব সম্পদ। সমাজবিজ্ঞানীরা
আবার মানবসম্পদকে মনে করেন কোনো ব্যক্তির সামাজিক সংগঠনে আবদ্ধ থাকার ক্ষমতা। কারণ সামাজিক জীবনের সফলতা আসে মানুষের দলবদ্ধ ও গোষ্ঠীগত প্রচেষ্টার দ্বারা। আর মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক বিবর্তনে সহায়তা করতে পারার ব্যক্তিক সক্ষমতা। ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান নিয়ে যারা কথা বলে থাকেন তারাও আধুনিক যন্ত্রনির্ভর যুগেও যন্ত্রের চেয়ে মানবের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তারা মনে করেন মানব সম্পদ হলো মানবশক্তির প্রয়োজনভিত্তিক প্রায়োগিক রূপ।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, সাধারণ জনসংখ্যাকে মানব সম্পদ হিসেবে গণ্য করা একটি অযৌক্তিক ধারণা। এর জন্য জনসংখ্যার ভেতর মৌলিক কিছু চিহ্ন বাছাই করা যেতে পারে যেমন: ১. সুস্বাস্থ্য: কোনো ব্যক্তি যখন সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে তখনই অর্থনৈতিক বা এর সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে, ২. যোগ্যতা বা দক্ষতা: এর দ্বারাই কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট কাজের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়, ৩. শিক্ষা বা সাক্ষরতা: জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে রূপ ধারণ করতে চাইলে শিক্ষার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বর্তমান বিশ্বে একটা মানুষকে অন্তত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক পর্যায় পার করা উচিত যার দ্বারা সামাজিক চাহিদা অনুযায়ী মানুষ সাক্ষরতা লাভ করবে, ৪. কর্মসংস্থান: সুস্বাস্থ্য, যোগ্যতা বা দক্ষতা এবং শিক্ষা থাকলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে মানবসম্পদের মূল্য নেই। কারো অর্জিত যোগ্যতা ও শিক্ষা কোথাও না কোথাও প্রয়োগ করার সুযোগ থাকতে হবেই।

প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কোনো দেশকে টিকে থাকতে হলে সে দেশকে অবশ্যই মানব সম্পদের দিক থেকে উন্নত হতে হবে। এই কথা শুধু দেশের ক্ষেত্রেই নয় বরং সমাজ ও ব্যক্তিকভাবেও অস্বীকার করার অযোগ্য। যার জন্য দেশ হিসেবে প্রথমেই নজর দিতে হবে সুস্থ নাগরিকদের প্রতি যাদেরকে কর্মদক্ষ করে তুলতে হবে। কর্মদক্ষতা সৃষ্টি নিয়ে ভাবতেই চলে আসবে শিক্ষার বিষয়টি। যা একেকজন ব্যক্তির মৌলিক অধিকার। শিক্ষার মাধ্যমেই প্রত্যেকে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অবগত হয়। আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক এবং উপানুষ্ঠানিকভাবে এটি অর্জনের সুযোগ থাকলেও যুগ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্জন বলতে আমরা আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জনকেই বুঝে থাকি। প্রত্যেক ব্যক্তিই উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে তার মনে লালন করা ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো কর্ম খুঁজে নেয়ার সুযোগ পেয়ে থাকে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত নয় এমন ব্যক্তির চেয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির আয় ৫২.৬% বেশি। মাধ্যমিক শিক্ষায় যারা শিক্ষিত নন এমন ব্যক্তিদের তুলনায় এই পর্যায়ে শিক্ষিতরা ৭.২% বেশি আয় করে থাকেন আর উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষিতরা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষিতদের চেয়ে আয়ের দিক থেকে ১৬.২% এগিয়ে। এ থেকেই বোঝা যায় কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের ভূমিকা। পরিতাপের বিষয় হলো যে, বাংলাদেশে মানবসম্পদ উন্নয়নের তেমন প্রচেষ্টা দেখা যায় না বললেই চলে। দেশে দিনের পর দিন বেকারত্ব বেড়েই চলছে অথচ এর কোনো সুরাহা নেই। বাংলাদেশ কাগজে-কলমে এগিয়ে চললেও আদতে এগিয়ে যাওয়ার চর্চা নেই। একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির প্রধান কাজই হবে নিজ উদ্যোগে অন্তত নিজের অর্থনৈতিক চাকাটি সচল রাখা। যখন সে নিজের চাকাটি সচল রাখবে তখন জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বেই। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের চর্চা নেই। আমরা সরকারনির্ভর মানব সম্পদ। সবসময় বেকারত্বের জন্য সরকারকেই দুষতে জানি অথচ নিজের থেকে কাজ করার মানসিকতা আমাদের নেই। যে কারণে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

২০১৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংঘ (United Nations Development Programme-UNDP) কর্তৃক প্রকাশিত মানব উন্নয়ন সূচক (Human Development Index-HDI)-এ দেখা যায়, নরওয়ে HDI ভ্যালু ০.৯৪৪ নিয়ে র্যাংকিং-এ প্রথম অবস্থানে আছে, সাথে বয়স্ক সাক্ষরতার হার ৯৯ যেখানে গড় আয়ু ৮১.৫ বছর। এর পরে অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, কানাডা,
সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক যথাক্রমে দ্বিতীয় থেকে দশম অবস্থানে। এদের প্রত্যেকেরই সাক্ষরতার হার ৯৯। এই তালিকায় সার্কভুক্ত দেশসমূহের মধ্য থেকে কেবল শ্রীলঙ্কা রয়েছে সেরা ১০০-তে। এই দেশটির HDI ভ্যালু ০.৭৫, র্যাংকিং ৭৩, বয়স্ক সাক্ষরতার হার ৮৯.১ এবং গড় আয়ু ৭৪.৩ বছর। আর আমাদের বাংলাদেশ ০.৫৫৮ HDI ভ্যালু নিয়ে অবস্থান করছে ১৪২-এ, বয়স্ক সাক্ষরতার হার ৫৭.৭ এবং গড় আয়ু ৭০ বছর। তালিকাটির ১৮৫ তে আছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক।

মোটামুটি একটা করুণ জায়গাতেই আছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার, বয়স্ক শিক্ষার হার, নারী শিক্ষার হার, মাথাপিছু আয়, সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াতেই হবে যদিও HDI জরিপে বেশ কয়েকটি অতিরিক্ত বিষয়েও নজর দেয়া হয়।

অন্যান্য দেশের তুলনায় এদেশ মাথাপিছু আয়ের দিক থেকেও পিছিয়ে যার একমাত্র কারণ অনুন্নত মানব সম্পদ এবং এর যথার্থ ব্যবহার না করা।

 কোনো দেশের সাক্ষরতার হারের ওপরই মানবসম্পদ উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই আমাদের প্রথমেই সচেতনভাবে শিক্ষার দিকেই মনোযোগ দিতে হবে এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিকল্প নেই।


মু. মিজানুর রহমান মিজান
ইমেইল: mail@mizanurrmizan.info


(দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত, আগস্ট ৪, ২০১৬)
Previous Post Next Post